
দরজায় কড়া নাড়ছে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও জনপ্রিয় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই ফুটবল মহাযজ্ঞকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। তবে সাধারণ মানুষের এই তুমুল আগ্রহ ও আবেগকে পুঁজি করে সাইবার জগতেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে মাঠে যাওয়ার টিকিট, আকর্ষণীয় হসপিটালিটি প্যাকেজ কিংবা আসরটি চলাকালীন বিভিন্ন লাভজনক কাজের সুযোগ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে অনলাইনে পাতা হয়েছে প্রতারণার ফাঁদ। ফিফার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের আদলে শত শত নকল ও ফিশিং ওয়েবসাইট তৈরি করে বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)।
সাইবার অপরাধীদের এই কৌশলী তৎপরতার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে এফবিআই জানিয়েছে, জালিয়াতির উদ্দেশ্যে তৈরি করা এই ওয়েবসাইটগুলো হুবহু ফিফার আসল পোর্টালের মতো দেখতে। সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে তারা মূল ওয়েবসাইটের বানানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সামান্য পরিবর্তন এনেছে, যা খালি চোখে বা তাড়াহুড়ো করে দেখলে সহজে ধরা পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে মূল ডোমেইনের পরিচিত ‘ডট কম’ (.com) এক্সটেনশনের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে ডট অর্গ (.org), ডট এক্সওয়াইজেড (.xyz), ডট লাইভ (.live) কিংবা ডট সেল (.sale)-এর মতো ভিন্ন ডোমেইন। শুধু খেলা দেখার টিকিট বিক্রির নামেই নয়, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিপুল কর্মসংস্থানের খোঁজ করা চাকরিপ্রার্থীদের ফাঁদে ফেলতেও খোলা হয়েছে ‘জবস-ফিফা’ কিংবা ‘ফিফা-হায়ারিং’-এর মতো আকর্ষণীয় নামের সব পোর্টাল। এসব সাইটে চাকরির ভুয়া আবেদন গ্রহণের আড়ালে আগ্রহীদের নাম, ই-মেইল ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর, স্থায়ী ঠিকানা থেকে শুরু করে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গোপনীয় তথ্য পর্যন্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের ব্যাংক জালিয়াতি বা পরিচয় চুরির (আইডেন্টিটি থেফট) কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া এই অদৃশ্য বিপদের গভীরতা উঠে এসেছে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান গ্রুপ-আইবি এবং বিটডিফেন্ডারের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও। তথ্যপ্রযুক্তি গবেষকেরা জানিয়েছেন, সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফলের পাশাপাশি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের স্পনসরড বিজ্ঞাপন, টেলিগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে এই বিপজ্জনক চক্রগুলো তাদের প্রচারণা চালাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রুপ-আইবির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ‘ঘোস্ট স্টেডিয়াম’ নামের একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র একাই ৩০০টিরও বেশি ফিশিং ওয়েবসাইট পরিচালনা করছে। তারা ফিফার আসল ডিজাইন হুবহু নকল করে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির টিকিট বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্বকাপের দিন যত ঘনিয়ে আসবে এবং খেলাধুলার এই আসর নিয়ে সাধারণ মানুষের উত্তেজনা যত বাড়বে, সাইবার অপরাধীদের এই তৎপরতা ও প্রতারণার পরিধি আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এই ধরনের বড় ও আন্তর্জাতিক সাইবার জালিয়াতি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে এফবিআই। সংস্থাটি জানিয়েছে, ফিফার কোনো তথ্য বা টিকিটের জন্য সার্চ ইঞ্জিনে প্রদর্শিত বিভিন্ন স্পনসরড লিংকে সরাসরি ক্লিক না করে ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে নিজে হাতে পুরো অফিশিয়াল ঠিকানাটি টাইপ করে প্রবেশ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। এছাড়া যেকোনো ওয়েবসাইটের ঠিকানার শেষে ‘ডট কম’ রয়েছে কি না তা খুঁটিয়ে যাচাই করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া যেকোনো সন্দেহজনক কিংবা চমকপ্রদ অফারের লিংক এড়িয়ে চলার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে।