
রূপসা-ভৈরব বিধৌত খুলনা জেলার বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের উপাদান। এমনই এক রূপসী ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদের নাম সেনহাটি। তবে এই সেনহাটির ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচিতি নিয়ে রয়েছে চমৎকার বৈচিত্র্য। খুলনা জেলাতেই যেন দুটি ভিন্নরূপে ধরা দেয় এই নাম। একদিকে জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে দাকোপ উপজেলায় পশুর নদীর তীরে শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে জেগে আছে এক ঐতিহাসিক সেনহাটি, যা একসময় প্রভাবশালী জমিদারদের শাসনাধীন ছিল। অন্যদিকে, খুলনা মহানগরীর ঠিক ওপারেই দিঘলিয়া উপজেলায় ভৈরব নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত আরেকটি ঐতিহাসিক সেনহাটি গ্রাম, যা দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক প্রাচীনতম বাতিঘর। একই জেলার ভিন্ন দুই প্রান্তে নদীর জল ছুঁয়ে থাকা এই জনপদ দুটি আজ পর্যটক, ইতিহাসবিদ এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দাকোপের পশুর নদী তীরের সেনহাটি মূলত তার প্রাচীন জমিদারি শাসনকাল ও গৌরবময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের জন্য প্রসিদ্ধ। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত এখানকার বিশাল জমিদার বাড়িটি আজও তার প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর ধ্বংসাবশেষ নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তৎকালীন বাংলা এবং ঔপনিবেশিক মিশ্র স্থাপত্যে গড়া এই প্রাসাদের বড় বড় অঙ্গন, খিলানযুক্ত দরজা, টালির চোখধাঁধানো নকশা আর রহস্যময় গোপন কক্ষগুলো যেকোনো দর্শনার্থীকে মুগ্ধ করে। এর পাশেই রয়েছে বিশাল শান বাঁধানো দিঘি, প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স, অতিথিশালা ও তৎকালীন শস্য গুদাম। এখানকার ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বাউল গান, পালাগান ও ভাটিয়ালির সুর আজও মিশে আছে, যা নবান্ন, দুর্গাপূজা কিংবা পহেলা বৈশাখের মেলায় নতুন প্রাণ পায়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলের ঘন জঙ্গল ও নদীবেষ্টিত এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি কৌশলগত গোপন ঘাঁটি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও বর্তমানে এনজিও ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে লবণ সহনশীল ফসল চাষ ও নারী ক্ষমতায়নের কাজ চলছে।
অপরদিকে, ভৈরব নদীর কোল ঘেঁষে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামটি সুপরিচিত তার প্রজ্ঞা ও সাহিত্যের আলোয়। ইতিহাস বলে, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি উচ্চশিক্ষিত হিন্দু পণ্ডিত ও সাহিত্যিকদের প্রধান আবাসস্থল হওয়ায় একে ‘বাংলার দ্বিতীয় কাশী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। ধারণা করা হয়, সেন রাজবংশের হাটি বা বসতি এবং তাদের প্রশাসনিক বাজার বা হাটকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল সেনহাটি। এই মাটির সবচেয়ে বড় অহংকার হলেন কালজয়ী কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, যাঁর ‘সদ্ভাবশতক’ কাব্যের অমর পঙক্তি “যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি” আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। কবির স্মৃতিবিজড়িত সেই ছায়াঘেরা বাগানবাড়ি, শান বাঁধানো ঘাট ও পোড়ামাটির কারুকার্যময় শিব ও কালী মন্দিরগুলো তৎকালীন বাংলার গ্রামীণ আভিজাত্যের পরিচয় দেয়। বর্তমানে সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কবির বাড়িটিকে সংস্কার করে গড়ে তুলেছে ‘কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার স্মৃতি সংগ্রহশালা’, যেখানে সংরক্ষিত আছে তাঁর ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র ও মূল্যবান পাণ্ডুলিপি। ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সেনহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াতে শতবর্ষ ধরে ভূমিকা রাখছে।
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই দুই জনপদই দারুণ উপভোগ্য। বিশেষ করে শীতকাল অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মৃদু আবহাওয়ায় এই অঞ্চলগুলো ঘুরে দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। দাকোপের সেনহাটিতে যেখানে সড়কপথে মোটরবাইক, বাস কিংবা ইজিবাইকে যাওয়া যায়, সেখানে দিঘলিয়ার সেনহাটিতে পৌঁছানো আরও সহজ। খুলনা শহরের জেলখানা ঘাট বা রকেট ঘাট থেকে ট্রলারে চড়ে মাত্র পাঁচ মিনিটে ভৈরব নদী পার হলেই দিঘলিয়ার সীমানা শুরু হয়, যেখান থেকে ইজিবাইকে চড়ে সহজেই কবির স্মৃতি সংগ্রহশালায় পৌঁছানো সম্ভব। যদিও দাকোপের সেনহাটিতে প্রাতিষ্ঠানিক থাকার সুব্যবস্থা নেই এবং সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো সমস্যা প্রকট হচ্ছে, তবুও স্থানীয় যুবকদের পর্যটন গাইড হিসেবে কাজ করার আগ্রহ এবং ঐতিহ্য রক্ষার নানামুখী উদ্যোগ এই অঞ্চলকে টেকসই ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ভৈরব ও পশুর নদীর তীরে সূর্যাস্ত দেখা, প্রাচীন স্থাপত্যের শৈল্পিকতা উপভোগ করা এবং বাংলার খাঁটি গ্রামীণ সংস্কৃতির স্বাদ নিতে সেনহাটি হতে পারে যেকোনো ভ্রমণপ্রেমীর জন্য এক দারুণ গন্তব্য।