
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক জেলা বাগেরহাটের অগণিত পুরাকীর্তির ভিড়ে স্বকীয় মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে চুনাখোলা মসজিদ। জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের চুনাখোলা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি সুলতানী আমলের নির্মাণশৈলীর এক অনন্য স্বাক্ষর বহন করছে। বিশ্বখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে মাত্র এক মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই স্থাপনাটি ১৫ শতকের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ঐতিহাসিকদের ধারণা মতে, হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর কোনো এক অনুগত কর্মচারী এই বর্গাকার একগম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময়ে এই এলাকায় চুন উৎপাদনের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে, যা থেকে গ্রাম ও মসজিদটি ‘চুনাখোলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চুনাখোলা মসজিদটি খান জাহানী নির্মাণরীতির এক সার্থক প্রতিফলন। ইটের তৈরি এই বর্গাকৃতি ইমারতটির বাইরের প্রতি দিকের দৈর্ঘ্য ১২.৫০ মিটার এবং এর দেয়ালগুলো প্রায় ২.১৪ মিটার পুরু। মসজিদের বিশাল ছাদ জুড়ে রয়েছে একটি অর্ধগোলাকৃতির গম্বুজ, যা ভেতরের দিকে স্কুইঞ্চের ওপর অত্যন্ত সুনিপুণভাবে স্থাপিত। মসজিদের কিবলা দেয়ালের অভ্যন্তরভাগে তিনটি খিলানযুক্ত মিহরাব রয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবটি চিরাচরিত নিয়মে দেয়ালের বাইরে প্রসারিত এবং তা ছাদ পর্যন্ত উঁচু। প্রবেশপথ হিসেবে পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে মোট পাঁচটি ধনুকাকৃতির খিলান দরজা রয়েছে, যা মসজিদটির নান্দনিকতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থাপত্য পরিভাষায় খিলান বলতে বোঝায় সেই বিশেষ বাঁকা কাঠামো যা একটি উঁচু স্থানকে ধারণ করে; চুনাখোলা মসজিদের প্রবেশপথগুলোতে এই খিলানরীতির চমৎকার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের চার কোণায় অবস্থিত চারটি মিনার খান জাহানী প্রথা অনুযায়ী গোলাকার এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর ঢালাই করা ব্যান্ড দ্বারা বিভক্ত। ইমারতটির কার্নিশগুলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে কিঞ্চিৎ বাঁকানোভাবে তৈরি করা হয়েছে। মসজিদের দেওয়ালে অলঙ্করণের ক্ষেত্রে জালির কাজ, লতাপাতা, যুক্ত বৃত্ত এবং বিষমকোণী চতুর্ভুজের মতো সূক্ষ্ম টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কাজ বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ে। যদিও সময়ের বিবর্তনে অনেক নকশা বিলীন হয়েছে, তবে বর্তমানে মিহরাবের কুলুঙ্গি ও খিলানগুলোতে এখনো সেই শৈল্পিক কারুকার্যের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার এই মসজিদটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বাগেরহাটের এই প্রাচীন স্থাপত্যটিকে ‘বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে মর্যাদা প্রদান করে। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে, যার ফলে ধ্বংসোন্মুখ দশা কাটিয়ে এটি পর্যটকদের কাছে পুনরায় আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সুলতানী আমলের এই স্থাপত্য কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির প্রকৌশল জ্ঞান ও ইতিহাসের এক কালজয়ী সাক্ষী হিসেবে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।