1. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
  2. khulnarprotichchobi@gmail.com : khulnarprotichchob :
  3. shobuj.khulna@gmail.com : al masum Shobuj : al masum Shobuj
খান জাহানি স্থাপত্যের অনন্য স্মারক: বাগেরহাটের বিলুপ্তপ্রায় সিঙ্গাইর মসজিদের ঐতিহাসিক পুনরুত্থান - khulnarprotichchobi
২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| বর্ষাকাল| বুধবার| রাত ১২:১১|
শিরোনামঃ

খান জাহানি স্থাপত্যের অনন্য স্মারক: বাগেরহাটের বিলুপ্তপ্রায় সিঙ্গাইর মসজিদের ঐতিহাসিক পুনরুত্থান

এস, এম আরাফাত আলী
  • Update Time : শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
Spread the love

 

দক্ষিণাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ বাগেরহাট জেলা যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর। এই জেলার বুক চিরে চলে যাওয়া খুলনা-বরিশাল মহাসড়কের কোল ঘেঁষে সুন্দরঘোনা গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এক গম্বুজবিশিষ্ট অনন্য এক পুরাকীর্তি, যা স্থানীয়ভাবে ‘সিঙ্গাইর মসজিদ’ বা ‘সিঙরা মসজিদ’ নামে পরিচিত। বিশ্ব ঐতিহ্য ষাট গম্বুজ মসজিদে প্রবেশের ঠিক আগ মুহূর্তে, মাত্র পঁচিশ মিটার দক্ষিণ-পূর্বে এর শান্ত ও নিভৃত অবস্থান পর্যটকদের নজর কেড়ে নেয়। যদিও এর কোনো দাপ্তরিক শিলালিপি পাওয়া যায়নি, যার কারণে এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণসাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে বাংলাপিডিয়ার তথ্য এবং এর চমৎকার নির্মাণশৈলী ও পোড়ামাটির অলংকরণ বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দৃঢ়ভাবে ধারণা করেন, এটি ১৫শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মুঘল আমলের প্রাক্কালে মহান স্থপতি হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর হাত ধরে নির্মিত হয়েছিল। দীর্ঘ অবহেলায় প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই স্থাপনাটি এখন দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক আকর্ষণ।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় অর্ধশতক আগে, অর্থাৎ ১৯৭০ সালের শুরুর দিকে এই ঐতিহাসিক ইমারতটি একেবারেই জরাজীর্ণ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় লোকচক্ষুর অন্তরালে পড়ে ছিল। প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে ১৯৭৫ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই মসজিদের সম্পূর্ণ সংরক্ষণের আইনি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এরপর থেকে কয়েক দফায় অত্যন্ত নিখুঁত ও ধারাবাহিকভাবে মেরামত এবং পুনর্নির্মাণ কাজের মধ্য দিয়ে মসজিদটিকে বর্তমানের এই সুসংরক্ষিত ও দৃষ্টিনন্দন অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। যদিও যুগের পর যুগ ধরে এর বাইরের অংশে ব্যাপক সংস্কার কাজ চালানোর কারণে আদিতে এই মসজিদের অবয়ব ঠিক কেমন ছিল, তা অনুমান করা আধুনিক স্থপতিদের জন্য বেশ কঠিন এক চ্যালেঞ্জ।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে সম্পূর্ণ ইটের তৈরি বর্গাকার এই এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি তৎকালীন খান জাহানি রীতির এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। এর বাইরের দিকের পরিমাপ প্রায় ১২.০৪ থেকে ১২.১৯ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এর দেয়ালগুলো প্রায় ২.১০ থেকে ২.১৩ মিটার পর্যন্ত ভীষণ পুরু, যা প্রাচীনকালের শক্তিশালী গাঁথুনির পরিচয় দেয়। এই ইমারতের প্রবেশদ্বারগুলোর নকশাও বেশ নান্দনিক; পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি দ্বিকেন্দ্রিক সূচ্যগ্র খিলানপথ, যার মধ্যে মাঝখানের দরজাটি দুই পাশের দরজার চেয়ে আকারে বেশ বড়। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদের চার কোণে ছাদ পর্যন্ত উঁচু চারটি বৃত্তাকার বুরুজ বা মিনার রয়েছে, যা নিয়মিত ব্যবধানে ছাঁচকৃত বন্ধনী দ্বারা বিভক্ত হয়ে মসজিদের সার্বিক সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তৎকালীন বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে এর কার্নিশগুলোকে সামান্য বক্র বা বাঁকানো অবয়বে তৈরি করা হয়েছে।

মসজিদের ভেতরের অংশে প্রবেশ করলে ছাদের চার দেয়ালের মাঝখানে পেনডেন্টিভ এবং উপরের কোণাগুলোতে স্থাপিত অর্ধ গম্বুজাকৃতির স্কুইঞ্চের এক অপূর্ব কারিগরি মেলবন্ধন দেখা যায়। এগুলো একত্রে চারটি বদ্ধ খিলানের ওপর ভর করে মসজিদের একমাত্র বিশাল গম্বুজটির ওজন ধরে রেখেছে, যা পুরো বর্গাকার কক্ষটিকে ছাতার মতো আবৃত করে আছে। সংস্কারের সময় এই গম্বুজের বাইরের দিকটা সমান বা মসৃণ করে দেওয়া হলেও, আদিতে এটি বিখ্যাত রণবিজয়পুর মসজিদের মতো বৃত্তাকার ইটের মনোরম সারি দ্বারা অলংকৃত ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পুরো মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দিকে তথা কিবলা দেওয়ালে রয়েছে একটি খাঁজকাটা খিলান মিহরাব, যার বাইরের অংশে কার্নিশ পর্যন্ত উঠে যাওয়া একটি আয়তাকার অভিপেক্ষপণ বা প্রক্ষিপ্ত অংশ রয়েছে। এই প্রধান মিহরাবের দুই পাশেও দুটি ছোট খাঁজকৃত খিলান কুলুঙ্গি রয়েছে।

সিঙ্গাইর মসজিদের মূল নান্দনিকতা লুকিয়ে আছে এর দেয়াল ও মিহরাবের গায়ে খোদাই করা অনন্য সাধারণ পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটার চমৎকার শিল্পকর্মে। এর কার্নিশের দুটি বন্ধনী নিখুঁত হীরকাকার নকশায় সজ্জিত এবং এদের মধ্যবর্তী স্থানটুকু তিন ভাগে বিভক্ত কুলুঙ্গির সারি দিয়ে সুনিপুণভাবে সাজানো। প্রধান মিহরাবের সুন্দর খাঁজ খিলানটি অলংকৃত ইটের পোস্তা থেকে সগৌরবে উদিত হয়েছে এবং এর দুই কোণের স্প্যানড্রিলে সুস্পষ্ট গোলাপের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অর্ধবৃত্তাকার এই মিহরাব কুলুঙ্গির ভেতরে রয়েছে চারটি অনুভূমিক প্যানেল, যা ঝুলন্ত মোটিফ দিয়ে সুসজ্জিত। খিলানের উপরিভাগে ছাঁচকৃত বন্ধনীর নিচ দিয়ে চলে গেছে ফুলসহ প্যাঁচানো লতার এক চমৎকার প্যানেল, যা জালি নকশাকৃত একটি প্রশস্ত আয়তাকার পাড় বা বর্ডারের মধ্যে চমৎকারভাবে আবদ্ধ ছিল। এই বর্ডারের ঠিক ওপরেই রয়েছে বদ্ধ পাপড়ির সারি দিয়ে সাজানো আরেকটি প্রক্ষিপ্ত বন্ধনী। প্রবেশদ্বার এবং মিহরাবের এই অলংকরণের সাদৃশ্য প্রমাণ করে যে, তৎকালীন কারিগরেরা কতটা গভীর মমতায় এই ধর্মীয় উপাসনালয়টি নির্মাণ করেছিলেন, যা আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে।

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025