
এস, এম আরাফাত আলী
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের আদান-প্রদান ও সংরক্ষণে ইউএসবি ড্রাইভ এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ বা কম ধারণক্ষমতার ড্রাইভগুলো ফেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অসচেতনতা ডেকে আনছে চরম ব্যক্তিগত ও আর্থিক ঝুঁকি। বাসাবাড়ি কিংবা কার্যালয়ে জমে থাকা পুরোনো ও ধীরগতির ফ্ল্যাশ ড্রাইভ অব্যবহৃত মনে করে অনেকেই তা অবহেলায় ডাস্টবিনে বা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন, যা পরবর্তীতে সাইবার অপরাধী বা অসাধু ব্যক্তির হাতে পড়ে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ থেকে কোনো ফাইল ‘ডিলেট’ করলেই তা চিরতরে মুছে যায়। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ প্রক্রিয়ায় ফাইল মুছে ফেললে মেমোরির সংশ্লিষ্ট অংশটি কেবল নতুন তথ্য লেখার জন্য উন্মুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়, কিন্তু মূল তথ্যের ডিজিটাল ছাপ বা অবশিষ্টাংশ সংরক্ষিত থেকে যায়। ফলে বিশেষায়িত ডাটা রিকভারি সফটওয়্যার ব্যবহার করে অত্যন্ত সহজেই সেই মুছে ফেলা ফাইলগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়। যদি সেই পুরোনো ড্রাইভটিতে আয়কর বিবরণী, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের স্ক্যান কপি, ব্যাংকিং সংক্রান্ত নথি, পেশাগত দাপ্তরিক ফাইল কিংবা গোপনীয় ব্যক্তিগত ছবি থাকে, তবে তা অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির হস্তগত হলে বড় ধরনের প্রতারণা, পরিচয় চুরি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো অপরাধ ঘটতে পারে। তাই ড্রাইভ ফেলার পূর্বে শুধুমাত্র বাহ্যিক ফাইল ডিলেট না করে ডাটা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত জরুরি।
কোনো অতিরিক্ত বাহ্যিক সফটওয়্যারের সহায়তা ছাড়াই অপারেটিং সিস্টেমের নিজস্ব ফিচারের মাধ্যমে ড্রাইভ ফরম্যাট করা সম্ভব। উইন্ডোজ চালিত কম্পিউটারে ড্রাইভ যুক্ত করার পর ফাইল এক্সপ্লোরারের ‘দিস পিসি’ অংশে প্রবেশ করে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসের ওপর মাউসের ডান ক্লিক করে ফরম্যাট অপশনটি বেছে নিতে হয়। যেহেতু ড্রাইভটি আর পুনরায় ব্যবহার করা হবে না, তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ফরম্যাটিং বা ‘কুইক ফরম্যাট’ অপশনটির টিক চিহ্ন তুলে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ফরম্যাটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। পূর্ণাঙ্গ ফরম্যাটিং প্রক্রিয়ায় ড্রাইভের প্রতিটি সেক্টরে শূন্য বা নতুন ডাটা ওভাররাইট হয়, যা পুরোনো তথ্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। তবে তার পূর্বে অবশ্যই ড্রাইভে কোনো দরকারী ফাইল থাকলে তা নিরাপদ কোনো বিকল্প স্থানে সরিয়ে নেওয়া আবশ্যক।
অত্যন্ত সংবেদনশীল, গোপনীয় বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বসম্পন্ন তথ্য থাকা ড্রাইভের ক্ষেত্রে কিংবা যেসব পুরোনো ড্রাইভ নষ্ট হয়ে গিয়ে কম্পিউটারে আর শনাক্তই হয় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে সফটওয়্যারভিত্তিক ফরম্যাটিং কার্যকর হয় না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে ড্রাইভটি শারীরিকভাবে বা ভৌতভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ পথ। ঐতিহ্যবাহী মেকানিক্যাল হার্ডডিস্ক ড্রাইভের ভেতরে থাকা গোলাকার ধাতব প্ল্যাটার হাতুড়ি বা পেরেক দিয়ে ছিদ্র করে নষ্ট করে দেওয়া যায়। অন্যদিকে আধুনিক এসএসডি বা পেনড্রাইভের ভেতরের সার্কিট বোর্ডে যুক্ত থাকা আয়তাকার মেমোরি চিপগুলো চেনি, ড্রিল মেশিন বা ড্রেমেল টুলস ব্যবহার করে শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত না করা পর্যন্ত তথ্য সুরক্ষার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তবে ড্রাইভ শারীরিকভাবে ধ্বংস করার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, কারণ ভাঙ্গার সময় ছিটকে আসা ধারালো ধাতব অংশ বা ফাইবারের সূক্ষ্ম কণা শারীরিক আঘাতের কারণ হতে পারে। একই সাথে ডাটা ধ্বংস করার কাজ শেষ হলেও তা যত্রতত্র ফেলে না দিয়ে নির্ধারিত ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক ওয়েস্ট পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে জমা দেওয়া উচিত। ক্ষুদ্র ও মূল্যহীন মনে হলেও অব্যবহৃত একটি ইউএসবি ড্রাইভ অসাবধানতার কারণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই তা ফেলে দেওয়ার আগে তথ্যের সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আধুনিক ডিজিটাল নাগরিকত্বের অন্যতম দায়িত্ব।