
শীতের নিশ্বাসে দিঘলিয়া উপজেলায় ফিরে আসে খেজুর রসের মায়া। প্রকৃতির এই অমৃত রস সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন গাছি ইয়ার আলী। তিনি আখন্দ গ্রুপের (সেফ ফুড) প্রতিষ্ঠাতার ঘের থেকে খেজুর রস সংগ্রহ করেন এবং তা দিয়ে গুড় তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এই পেশায় তিনি তিন মাস কাটান, আর বাকি নয় মাস বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকেন।
খেজুর রস সংগ্রহের মরসুমে দিঘলিয়ার পথে পথে গাছিরা দেখা যায়। হাতে ধারালো দা, পিঠে ঝোলানো মাটির হাঁড়ি নিয়ে ভোরের আলোয় তারা উঠে পড়ে গাছে। গাছের মগজ কেটে দেয়ার পর রাতের নীরবতায় ফোঁটা ফোঁটা রস ঝরে পড়ে। এই রসের ঘ্রাণ মিশে যায় বাতাসে, মনকে মাতোয়ারা করে তোলে। সকালের পাখির ডাকে শুরু হয় রস সংগ্রহের মহাযজ্ঞ। গাছি ইয়ার আলী গাছের মাথায় চড়ে, দড়ি বেঁধে নিরাপদে ঝুলে থাকেন, যেন তিনি আকাশের সাথে মিলেমিশে একাকার। এক ফোঁটা রসও নষ্ট হতে দেন না, হাঁড়িতে জমা হয় সেই সুমিষ্ট অমৃত রস। সন্ধ্যায় ফিরে এসে তিনি গাছ পরিচর্যা করেন, কেটে ফেলা অংশ বেঁধে দেন, যাতে পরদিন আবার রসের ধারা বয়ে চলে।
দিঘলিয়া ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম থেকে অন্যান্য জনপদ রসের মহিমায় উদ্ভাসিত। রস থেকে তৈরি হয় লালি, তারপর গুড়ের পাতলা ঝোলা, দানাদার, পাটালি। প্রতিটি গুড়ের টুকরোতে মিশে থাকে গাছির ঘাম, তাদের প্রাণের উষ্ণতা। শীত যত গভীর হয়, রস তত মিষ্টি, যেন প্রকৃতি নিজেই উপহার দেয় এই মধুর বর্ষণ।
কিন্তু এই মধুরতার পিছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর উদ্বেগ। একসময় পথে, পুকুরপাড়ে, ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে থাকত অসংখ্য খেজুর গাছ। প্রতি বাড়িতে রসের হাঁড়ি ঝুলত, গুড় তৈরি হতো পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গী ছিল এই গাছের পাতা থেকে পাটি, ডালপালা থেকে জ্বালানি। ইয়ার আলী এ প্রতিবেদককে জানান, দিনেদিনে সব মিলিয়ে খেজুর গাছ বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। যে গাছ দশ বছর রস দেয়, তার সংখ্যাও দিন দিন কমছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে যেন একটি সভ্যতার অংশ মুছে যাচ্ছে নীরবে।
ইয়ার আলীর জীবন তাগিদের চলার পথ খেজুর রস সংগ্রহ করে এক ভাগ মালিকপক্ষ আরেক ভাগ নিজে এলাকাভিত্তিক মানুষের কাছে বিক্রি করে। এই পেশা তাকে শীতের মৌসুমে জীবিকা দেয়, আর বাকি সময়ে তিনি বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকেন। তার জীবন দিঘলিয়ার খেজুর রসের ইতিহাসের এক অংশ, যা এখন বিলুপ্তির পথে চলেছে।