
দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খুলনা মহানগরীর বুকে ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা আজ সাত দশক পেরিয়েও অত্র অঞ্চলের দ্বীনি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি খুলনা বিভাগ তথা সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ দ্বীনি বিদ্যাপীঠ হিসেবে স্বীকৃত। বিভাগীয় পর্যায়ের আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে এটি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যে, দাখিল ও আলিম পরীক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রে এই মাদ্রাসার একচেটিয়া সুনাম আজ সর্বজনবিদিত। বিশেষ করে খুলনা বিভাগের দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিলসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্র হিসেবে এই মাদ্রাসার গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬৬ সালের ১ জুলাই তৎকালীন সরকারের অনুমোদন লাভ করে এটি। এরপর স্থানীয় বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিদের নিরলস প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে এটি কামিল পর্যায়ে উন্নীত হয়। বর্তমানে এই মাদ্রাসার অবকাঠামো ও শিক্ষার মান অত্যন্ত আধুনিক ও যুগোপযোগী। দীর্ঘকাল ধরে খুলনার স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে এই মাদ্রাসাটিকে ঢাকা বা সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার আদলে পূর্ণাঙ্গ সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের দাবি জানানো হচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ২০২০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে যে ৫০টি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করেছিলেন, তার একটি এই মাদ্রাসার প্রাঙ্গণেই নির্মিত হয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিক্ষার গুণগত মানের দিক থেকে খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে প্রাথমিক স্তরের ইবতেদায়ী থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর কামিল পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে। বিজ্ঞান ও মানবিক—উভয় শাখাতেই শিক্ষার্থীরা মেধার স্বাক্ষর রাখছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত জাতীয় বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহণ করে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিক রূপ তুলে ধরছে। উচ্চতর পর্যায়ে এখানে আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল হাদিস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। প্রতিবছরই এই মাদ্রাসার কৃতি শিক্ষার্থীরা দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পেয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বয়ে আনছে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য এই মাদ্রাসায় রয়েছে সকল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। বিশাল খেলার মাঠ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং গবেষণাগারের পাশাপাশি বিতর্ক চর্চার জন্য রয়েছে সক্রিয় ডিবেটিং সোসাইটি। ছাত্রীদের জন্য পৃথক কমন রুম ও অভ্যন্তরীণ বিনোদনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে আরও শিক্ষার্থী-বান্ধব করে তুলেছে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কেবল পড়াশোনায় নয়, বরং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে নিয়মিত সাফল্য অর্জন করছে। মাদ্রাসার বিশাল ও আধুনিক লাইব্রেরিটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাতে অনন্য ভূমিকা রাখছে, যেখানে কুরআন-হাদিস থেকে শুরু করে ইসলামের ইতিহাস ও ফিকহ শাস্ত্রের অমূল্য সব গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে।
আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে এই মাদ্রাসার মডেল মসজিদটি একটি স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। খান জাহান আলী সড়কে অবস্থিত এই চারতলা মসজিদে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে, যা একে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এছাড়াও বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদের জন্য ল্যাবরেটরিতে হাতে-কলমে শিক্ষা ও গবেষণার অবারিত সুযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে খুলনা আলিয়া কামিল মাদ্রাসা আধুনিক শিক্ষা, ধর্মীয় নৈতিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়, যা প্রতিনিয়ত দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।