
(১৯০০–১৯৮৫)
বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এক যুক্তিবাদী দার্শনিক ও মুক্তচিন্তার বাতিঘর
বাংলার ইতিহাসে যাঁরা চিন্তার স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ ও প্রশ্ন করার সাহসকে ধারণ করেছেন—আরজ আলী মাতুব্বর তাঁদের অন্যতম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও আত্মশিক্ষা, অধ্যবসায় ও তীব্র জ্ঞানপিপাসার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন স্বশিক্ষিত দার্শনিক হিসেবে। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আজীবন যুক্তিনির্ভর অবস্থান নেওয়া এই মানুষটি আজও বাঙালির চিন্তার জগতে প্রাসঙ্গিক।
জন্ম ও শৈশব
আরজ আলী মাতুব্বর জন্মগ্রহণ করেন ১৯০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর (বাংলা ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৩রা পৌষ), তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল জেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রামে। তিনি ছিলেন এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তাঁর অগ্রযাত্রা খুব দূর এগোয়নি। তবে শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবণতা ও সত্যের অনুসন্ধিৎসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শৈশবের এক মর্মান্তিক ঘটনা তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। মায়ের মৃত্যুর পর মৃতদেহের ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে মোল্লারা জানাজা পড়তে অস্বীকৃতি জানায় এবং দাফন না করার ফতোয়া দেয়। শেষ পর্যন্ত পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে তাঁর মায়ের দাফন সম্পন্ন করেন। এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা আরজ আলীর মনে ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক আজীবন প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়।
জ্ঞানসাধনা ও আত্মশিক্ষা
আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন স্বশিক্ষিত মানুষ। পায়ে হেঁটে প্রতিদিন লামছড়ি গ্রাম থেকে বরিশাল শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতেন এবং সেখানে থাকা প্রায় সব বাংলা বই গভীর মনোযোগে পাঠ করতেন। দর্শন ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। স্থানীয় পাঠাগারে দর্শনবিষয়ক বই সীমিত থাকায় তাঁর অনুসন্ধান থেমে থাকেনি।
এই সময় তাঁর পরিচয় হয় বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের দর্শনের শিক্ষক কাজী গোলাম কাদিরের সঙ্গে। আরজ আলীর বিশ্লেষণী বুদ্ধি ও যুক্তিবোধে মুগ্ধ হয়ে কাদির তাঁকে কলেজ লাইব্রেরি থেকে দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের বই ধার দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এই সুযোগই তাঁর চিন্তাজগতকে আরও গভীর ও বিস্তৃত করে তোলে।
দর্শন ও চিন্তাধারা
আরজ আলী মাতুব্বর মূলত বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ধর্ম, সমাজ, জীবন ও অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে। অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর লেখায় মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং মানবিক মূল্যবোধের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“প্রশ্ন না করলে মানুষ পশুসমান থেকে যায়।”
এই প্রশ্ন করার অধিকার ও চিন্তার স্বাধীনতাই ছিল তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তি।
গ্রন্থ ও রচনা
আরজ আলী মাতুব্বর জীবদ্দশায় বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
সত্যের সন্ধানে
সৃষ্টি রহস্য
অনুমান
মানবতাবাদ
ধর্ম ও সমাজ
এই গ্রন্থগুলোতে ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও মানবজীবনের নানা প্রশ্ন তিনি যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণে উপস্থাপন করেছেন।
আরজ মঞ্জিল ও গ্রন্থাগার
নিজের সমাধির পাশেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন “আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি”। তাঁর কাছে লাইব্রেরিই ছিল প্রকৃত উপাসনালয়। আমিনের কাজ করে সঞ্চিত প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয় করে এই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
সমাধি ও দেহদান
আরজ আলী মাতুব্বর জীবিত থাকতেই নিজের সমাধি নিজ হাতে নির্মাণ করেন। সমাধিটির একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হলো—এর ভেতরে কোনো মৃতদেহ নেই; সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁর চুল, দাড়ি ও নখ। স্থানীয় ধর্মীয় আপত্তি উপেক্ষা করে তিনি সমাধির মেঝেতে নিজ হাতে কংক্রিট ঢালাই করেন এবং ওপরে কংক্রিট স্ল্যাব স্থাপন করেন।
মৃত্যুর আগে তিনি নিজের দেহ ও চোখ দান করে যান বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজে—চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার স্বার্থে।
মৃত্যু
১৩৯২ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসের শেষদিকে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় তিনি শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। ১ চৈত্র (১৯৮৫ সাল) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতাল প্রাঙ্গনে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তাঁর মরদেহ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উত্তরাধিকার
আরজ আলী মাতুব্বর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার মানুষ ছিলেন না, ছিলেন না কোনো সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি। তবু তিনি বাঙালির চিন্তার ইতিহাসে এক অনন্য নাম। আজও তাঁর চিন্তা প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তির আলো জ্বালায় এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।
শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও আরজ আলী মাতুব্বর প্রমাণ করে গেছেন—
একজন কৃষকও দার্শনিক হতে পারেন, যদি তাঁর হাতে থাকে প্রশ্ন করার সাহস।
তথ্যসূত্র : অনলাইন