
দেশের জ্বালানি খাতে গত কয়েক বছর ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চললেও হঠাৎ করেই এর আমদানিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। প্রতি বছর যেখানে চাহিদার প্রবৃদ্ধি গড়ে ১০ শতাংশের উপরে থাকে, সেখানে বিদায়ী ২০২৫ সালে উল্টো আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। আমদানির এই নিম্নমুখী প্রবণতার কারণে বর্তমানে বাজারে এলপিজির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের পকেটে। দেশের অনেক এলাকায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সিলিন্ডার। বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশে রেকর্ড ১৬ লাখ ১০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। বিশেষ করে বছরের শেষ প্রান্তিকে আমদানির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় মজুত ফুরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাব। বর্তমানে দেশে ৫২টি কোম্পানির এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স থাকলেও আমদানি সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৩টির। বিস্ময়কর তথ্য হলো, গত বছর নিয়মিতভাবে পণ্যটি আমদানি করেছে মাত্র ৮টি কোম্পানি। বছরের শেষ দিকে এসে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এলপিজি আনা বন্ধ করে দিলে বাজারে কৃত্রিম শূন্যতার সৃষ্টি হয়। বিইআরসির কর্মকর্তাদের দাবি, মাসভিত্তিক আমদানির তথ্য সরকারের কাছে আগে থেকেই ছিল, তবে যথাযথ সময়ে আমদানির অনুমোদন না পাওয়ায় এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন ‘লোয়াব’ এই সংকটের জন্য সরাসরি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘসূত্রিতাকে দায়ী করছে। তাদের অভিযোগ, এক বছর আগে আমদানির অনুমতি এবং নতুন প্ল্যান্টের সুযোগ চাওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আটকে ছিল।
অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এলপিজি সংকটে ঘি ঢেলেছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি পরিবহনে ব্যবহৃত বিপুল সংখ্যক জাহাজ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ওপর ইরান থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং চীনসহ বড় দেশগুলোর বৈশ্বিক বাজার থেকে বাড়তি গ্যাস কেনার প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পণ্যটি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমদানির এই অপ্রতুলতার কারণে খুচরা বাজারে ভোক্তাদের ভোগান্তি এখন চরমে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না আখতারের মতো অনেক সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেছেন যে, নির্ধারিত মূল্য ১,৩০৬ টাকা হলেও বাস্তব চিত্রে ২,৩০০ টাকার নিচে গ্যাস মিলছে না। অনেক পরিবার এখন চড়া দাম আর সংকটের মুখে বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎচালিত চুলায় ঝুঁকছে, যা বিদ্যুৎ খাতেও বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি এখন নড়েচড়ে বসেছে। সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে জ্বালানি বিভাগ থেকে এলপিজি আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র খোলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি আমদানিকারকদের আমদানির সীমা বাড়ানোর অনুমতিও দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, আমদানির এই নতুন উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি মিটে যাবে এবং দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। তবে ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিইআরসি।