
সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের যে অভিযোগ উঠেছে, তার একটি বড় অংশই যে কৃত্রিম এবং অসাধু চক্রের কারসাজি, তার প্রমাণ মিলেছে ফরিদপুরে প্রশাসনের বিশেষ অভিযানে। সাধারণ মানুষ যখন পাম্পে পাম্পে ঘুরে তেল পাচ্ছে না, তখন খোদ ফিলিং স্টেশনগুলোতেই হাজার হাজার লিটার তেল মজুদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া তেল সংকটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন স্টেশনে এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে দেখা যায়, বাইরে “তেল নেই” লেখা পোস্টার টাঙিয়ে রাখলেও ভেতরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।
অভিযানের শুরুতে হোসেন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তেল বিক্রয় বন্ধ রেখে সাধারণ গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্টেশনের ট্যাংকগুলো পরীক্ষা করতেই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। সেখানে প্রায় ২৮ হাজার লিটার জ্বালানি মজুদ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৭ হাজার লিটার পেট্রোল, সাড়ে ৬ হাজার লিটার অকটেন এবং সাড়ে ১৪ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল ছিল। এই জালিয়াতি ও জনভোগান্তি তৈরির অপরাধে ওই স্টেশনটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহকদের কাছে তেল বিক্রির নির্দেশ প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইভাবে রয়্যাল ফিলিং স্টেশনেও জালিয়াতির চিত্র ফুটে ওঠে। সেখানে মেশিন বিকল থাকার অজুহাত দিয়ে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখা হলেও অভিযানে দেখা যায় সেখানে ২৫ হাজার ৯০০ লিটার জ্বালানি মজুদ রয়েছে। যদিও শুরুতে কর্তৃপক্ষ কারিগরি সমস্যার কথা বলেছিল, তবে প্রশাসনের চাপের মুখে অভিযানের সময়ই তারা রহস্যজনকভাবে মেশিন সচল করে ফেলে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা অস্থিরতা থাকলেও দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার জন্য অসাধু সিন্ডিকেটই প্রধানত দায়ী। সাধারণত দেশে ৪৫ থেকে ৬০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকে এবং নিয়মিত বিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে তেলের জাহাজ ভিড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১২ দিনের মজুদ থাকলেও তা একেবারে হাহাকার তৈরি করার মতো পর্যায় নয়। মূলত হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক উত্তজনাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী গোপনে তেল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে, যাতে পরবর্তীতে উচ্চ মূল্যে তা বিক্রি করা যায়। এই কৃত্রিম সংকট সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ফরিদপুরের এই অভিযানের পর সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই তথাকথিত তেল সংকট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল জরিমানা নয়, বরং যারা জাতীয় এই সংকটের সময় জ্বালানি মজুদ করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ের এই অভিযানগুলো অব্যাহত থাকলে মজুদদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে পড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।