
সুন্দরবনের বুক থেকে বনদস্যুদের চিরতরে নির্মূল করতে আবারও বড় ধরনের সাফল্যের মুখ দেখেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিদের ত্রাস, কুখ্যাত ‘করিম শরীফ বাহিনী’র আস্তানায় চালানো হয়েছে এক দুঃসাহসিক অভিযান। “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামক বিশেষ এই অভিযানে কোস্ট গার্ডের সাথে দস্যুবাহিনীর তীব্র বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরবর্তীতে পিছু হটতে বাধ্য হওয়া করিম শরীফ বাহিনীর ৩ জন সক্রিয় সদস্যকে অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। এই সফল অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন।
কোস্ট গার্ডের সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালা নদীর মরা চানমিয়া খাল এলাকায় একদল দস্যু অবস্থান করছে—এমন একটি সুনির্দিষ্ট ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড বেইস মোংলা এবং স্টেশন কোকিলমনি যৌথভাবে এই অভিযানের ছক আঁকে। গত ১৩ মে বিকেল থেকে সুন্দরবনের ওই দুর্গম ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে টানা দুই দিন ধরে চলে শ্বাসরুদ্ধকর এই চিরুনি অভিযান। একপর্যায়ে দস্যুদের আস্তানার কাছাকাছি পৌঁছালে কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে জঙ্গল থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে ডাকাত দলের সদস্যরা। সরকারি জানমাল রক্ষার্থে এবং আত্মরক্ষার খাতিরে কোস্ট গার্ডের জোয়ানরাও তাৎক্ষণিক পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করলে পুরো এলাকায় এক রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। তীব্র গোলাগুলির মুখে টিকতে না পেরে দস্যুরা বনের গভীরে পালানোর চেষ্টা করলে কোস্ট গার্ডের চৌকস দল ধাওয়া দিয়ে তিনজনকে পাকড়াও করে।
গ্রেপ্তারকৃত দস্যুদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী মেহেদী হাসান এবং ১৯ বছরের তরুণ রমজান শরীফ। আটককৃত অপরজন হলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী এনায়েত। দস্যুদের আস্তানা এবং তাদের দেহ তল্লাশি করে কোস্ট গার্ডের দল উদ্ধার করেছে ৩টি মারাত্মক একনলা বন্দুক, ১টি দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি পিস্তল, ৪৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১৮৭ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, ২টি কার্যকরী ওয়াকিটকি ও ৪টি চার্জার। এই বিপুল যুদ্ধ সরঞ্জাম থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তারা সুন্দরবনে বড় ধরনের কোনো নাশকতার ছক কষছিল।
কোস্ট গার্ডের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত দস্যুরা স্বীকার করেছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের গহীনের বিভিন্ন নদী ও খালের সংযোগস্থলে জাল পেতে রেখে মাছ ধরা জেলে, মধু সংগ্রহকারী মৌয়াল এবং গোলপাতা সংগ্রহকারী বাওয়ালিদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আসছিল। নিরীহ এই বনজীবীদের অপহরণ করে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল তাদের মূল পেশা। এর বাইরেও মাছ ধরার ট্রলার ও বনজ সম্পদ বহনকারী বাণিজ্যিক নৌযানগুলো থেকে তারা নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা বা জিজিয়া কর তুলতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের গহীনে চলে আসা এই দস্যুতার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার বননির্ভর মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছিল। স্থানীয় ভুক্তভোগী বনজীবীরা জানান, এই করিম শরীফ বাহিনীর আতঙ্কে অনেক জেলে ও মৌয়াল বনের নির্ধারিত ও নিরাপদ জোনে গিয়ে জীবিকা নির্বাহের সাহস পেতেন না। বনে প্রবেশ করলেই তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি হতে হতো, যা তাদের চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এর আগে গত ১৩ মে বন বিভাগের বিশেষ সহায়তায় এই বাহিনীর কবলে জিম্মি থাকা চারজন ভাগ্যবিড়ম্বিত জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, যা এই অভিযানের পথকে আরও সুগম করে।
বর্তমানে আটককৃত এই তিন দুর্ধর্ষ বনদস্যুর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়েরসহ পরবর্তী কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে হুশিয়ারি দিয়ে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনের বুক থেকে দস্যুতার শেষ চিহ্নটি মুছে না যাওয়া পর্যন্ত এবং এই গহীন অরণ্যকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ না করা পর্যন্ত “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” এর মতো কঠোর ও আকস্মিক অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখা হবে।