
ক্রিকেটের চিরায়ত ব্যাকরণ মেনে জয়টা অবধারিতই ছিল বাংলাদেশের জন্য। কিন্তু স্নায়ুর চাপ যেখানে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, সেখানে জয় নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বস্তি মেলা ভার। আজ সকালে মিরপুর ও সিলেটের সবুজ চত্বরে তেমন এক চরম নাটকীয়তার সাক্ষী হলো ক্রিকেট বিশ্ব। গালিতে মেহেদী হাসান মিরাজের সহজ ক্যাচ মিস আর ফিল্ডারদের চিরচেনা ভুল-বোঝাবুঝিতে যখন এক লহমায় সমর্থকদের মনে চরম দুশ্চিন্তার মেঘ দানা বাঁধছিল, ঠিক তখনই আলোর দিশারী হয়ে এলেন তাইজুল ইসলাম। চরম উত্তেজনার মুহূর্তগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাজিদ খানকে সাজঘরে ফিরিয়ে শঙ্কা দূর করেন তিনি। যে কাঙ্ক্ষিত উইকেটের জন্য টাইগারদের দীর্ঘ ৭২টি বল অপেক্ষা করতে হয়েছিল, সেই ডেডলক ভাঙতেই চেনা ছন্দে ফেরে বাংলাদেশ। পরের দুটি উইকেট পেতে দলটিকে খরচ করতে হয়েছে মাত্র ১২টি বল। সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে থাকা মারকুটে ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ৯৪ রানে ফিরিয়ে জয়ের পথ সুগম করেন শরিফুল ইসলাম। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের ইনিংস ৩৫৮ রানে থামলে, ৭৮ রানের ব্যবধানে এক অবিস্মরণীয় জয় দিয়ে রাঙানো হয় নতুন ইতিহাস।
অথচ এই মহাকাব্যিক জয়ের পথটা আজ সকালে এক অলৌকিক আশঙ্কায় ঢাকা পড়েছিল। আগের চার দিন ধরে রাতের বেলা মুষলধারে বৃষ্টি হলেও সকালের সূর্য হেসে উঠেছিল আপন মহিমায়। কিন্তু আজকের সকালটা যেন অন্য গল্পের আভাস দিচ্ছিল। নতুন দিনের আলো ফোটার সাথে সাথেই শুরু হয় প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিবিলাস। পাকিস্তানের সামনে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে রান তাড়া করার অসম্ভব সমীকরণ থাকলেও, বাংলাদেশের বড় প্রতিপক্ষ ছিল প্রকৃতির এই বৈরি আচরণ। প্রকৃতির বৈরিতা ম্যাচটিকে ড্রয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন একটা ফিসফাসও গ্যালারিতে উঠেছিল। তবে সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে খেলা শুরু হতে মাত্র ১৫ মিনিট বিলম্ব হয়। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি স্বাগতিকদের। মাত্র এক ঘণ্টার সুনিপুণ ও নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে খুররম শাহজাদকে শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট করে বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো বাংলাদেশ দল। ম্যাচ ও সিরিজ নির্ধারণী এই ইনিংসে একাই ৬ উইকেট শিকার করে লাল-সবুজের জয়ের মহাকাব্যের প্রধান নায়ক বনে যান তাইজুল ইসলাম।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে আগের দিনের এক অনবদ্য লড়াই ও ফিরে আসার গল্প। গতকাল যখন সালমান আগা আর মোহাম্মদ রিজওয়ান মিলে ১৩৪ রানের এক চোখ রাঙানো জুটি গড়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিতে চাচ্ছিলেন, তখন পুরো স্টেডিয়াম জুড়েই ছিল নিস্তব্ধতা। তবে গতকাল শেষ বিকেলেই জাদুকরী ঘূর্ণিতে জোড়া আঘাত হেনে প্রতিপক্ষের সেই প্রতিরোধ ভেঙে দিয়েছিলেন তাইজুল। ফলে আজ সকালে লক্ষ্যটা খুব পরিষ্কার ছিল; বাংলাদেশের দরকার ছিল মাত্র ৩টি উইকেট আর পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল ১২১ রান। রিজওয়ানের লড়াকু ৯৪ এবং সাজিদের ২৮ রান সফরকারীদের ম্যাচে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও, টাইগারের বোলিং তোপের সামনে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। মিরপুর এবং সিলেট টেস্ট জুড়েই সফরকারী পাকিস্তান কোনো বিভাগেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। প্রতিবারই যখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করেছে, বাংলাদেশ ঠিক তখনই পাল্টা আঘাত হেনে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ আড়াই যুগের পথচলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন উৎসবের উপলক্ষ আর কখনোই আসেনি। সাদা পোশাকের আভিজাত্যের লড়াইয়ে নিজেদের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো দলকে টানা চার ম্যাচে হারানোর অনন্য এক রেকর্ড গড়ল বাংলাদেশ। অথচ একসময় এই পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ১৩টি টেস্টে জয়ের কোনো খতিয়ান বা নূন্যতম সুখস্মৃতিও ছিল না টাইগারদের। অতীত ব্যর্থতার সেই গ্লানি মুছে ঘরের মাঠে রচিত হলো এক অনন্য রূপকথা। কোনো তালিকা বা পরিসংখ্যানের খতিয়ান ছাড়াই বলা যায়, এই পুরো সিরিজে বাংলাদেশ খেলেছে যোগ্যতর দল হিসেবেই। এই অবিস্মরণীয় সিরিজ জয় কেবল পাকিস্তানের বিপক্ষে এক ঐতিহাসিক ক্রিকেটীয় আধিপত্যই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী এবং রোমাঞ্চকর এক নতুন পথচলার শুভ সূচনা এনে দিয়েছে।