
যানজটের ভোগান্তি এড়াতে কিংবা কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে বর্তমান যুগে ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে কেনাকাটা করার প্রবণতা শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই বিপুল জনপ্রিয়। ফেসবুক পেজ কিংবা বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট থেকে নিয়মিত পার্সেল বা খাবার অর্ডার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন আধুনিক নাগরিকেরা। ক্রেতাদের এই দৈনন্দিন নির্ভরতা ও সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে এবার সাইবার অপরাধের দুনিয়ায় যুক্ত হয়েছে এক মারাত্মক ও অভিনব প্রতারণার ফাঁদ। নকল ডেলিভারি ম্যান সেজে ওটিপি এবং ফোনকল চুরির এই নতুন চক্রান্তে সাধারণ গ্রাহকেরা মুহূর্তের মধ্যে তাদের সারাজীবনের উপার্জিত অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। কোনো ক্ষতিকর অ্যাপ বা ম্যালওয়্যার ছাড়াই, সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক কৌশলের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই অভিনব ডিজিটাল ডাকাতি বর্তমানে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে।
এই ভয়ংকর প্রতারণার জালটি যেভাবে ছড়ানো হয়, তা রীতিমতো যেকোনো থ্রিলার গল্পের মতো নিখুঁত। ধরা যাক, আপনি অধীর আগ্রহে আপনার কাঙ্ক্ষিত কোনো পার্সেল বা অনলাইন অর্ডারের খাবারের অপেক্ষা করছেন। ঠিক তখনই আপনার মুঠোফোনে একটি কল আসবে এবং ওপাশ থেকে অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় নিজেকে ডেলিভারি এজেন্ট দাবি করে একজন ব্যক্তি কথা বলবেন। তিনি জানাবেন যে তিনি আপনার দোরগোড়ায় বা কাঙ্ক্ষিত লোকেশনে চলে এসেছেন, কিন্তু সার্ভার বা সিস্টেমের ত্রুটির কারণে আপনার মোবাইল নম্বরটি ভেরিফাই বা যাচাই করতে পারছেন না। এই যান্ত্রিক জটিলতার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে তিনি আপনাকে একটি নির্দিষ্ট ‘ইউএসএসডি’ কোড ফোনে ডায়াল করার জন্য অনুরোধ জানাবেন। ওপাশের মানুষের কথাকে সত্য ও স্বাভাবিক ধরে নিয়ে আপনি যখনই সেই কোডটি আপনার ফোনে চাপবেন, তখনই স্ক্রিনে একটি ক্ষণস্থায়ী বা পলকের নোটিফিকেশন ভেসে উঠে নিমেষেই উধাও হয়ে যাবে, যা পড়ার সময়ও পাওয়া যায় না। কিন্তু এই একটিমাত্র ডায়ালের মাধ্যমেই আপনার অজান্তে ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে হ্যাকারদের হাতে।
প্রকৃতপক্ষে এই কোডটি ডায়াল করার সাথে সাথেই স্মার্টফোনটিতে গোপনে ‘কল ফরোয়ার্ডিং’ সুবিধা সচল হয়ে যায়। এর ফলে ভুক্তভোগীর ফোনে সাধারণ কোনো কল আসা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং তার নম্বরে আসা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হয়ে চলে যায় সাইবার অপরাধীদের গোপন নম্বরে। এই কল ফরোয়ার্ডিংয়ের ভয়ানক দিকটি হলো, এর মাধ্যমে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের ভেরিফিকেশন কল, ক্রেডিট কার্ডের ওটিপি কনফার্মেশন কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধারের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সব ভয়েস বার্তা ও মেসেজ অপরাধীরা নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেয়। যেহেতু ইউএসএসডি হলো একটি সেশনভিত্তিক টেক্সট মেসেজিং পরিষেবা যা সরাসরি মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে এবং এর জন্য কোনো আলাদা অ্যাপ ডাউনলোড করতে হয় না, তাই যেকোনো সাধারণ বা বাটন ফোনেও এই প্রতারণা সমানভাবে কার্যকর। কোনো সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ট্রেইল না থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও এই অদৃশ্য জালিয়াতির ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
ডিজিটাল দুনিয়ার এই নতুন অদৃশ্য আতঙ্ক থেকে নিজেকে ও নিজের কষ্টার্জিত অর্থ সুরক্ষিত রাখতে এখন থেকেই চরম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অপরিচিত নম্বর থেকে আসা কোনো ডেলিভারি ম্যানের কল পেলে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল কাস্টমার কেয়ার নম্বর বা অ্যাপ থেকে সেই এজেন্টের সত্যতা ও পরিচয় নিখুঁতভাবে যাচাই করে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অপরিচিত কোনো ব্যক্তির প্ররোচনায় বা অনুরোধে নিজের ফোনে কোনো অস্পষ্ট কোড ডায়াল করা যাবে না। একই সাথে, নিজের স্মার্টফোনের সেটিংস অপশনে গিয়ে নিয়মিতভাবে ‘কল ফরোয়ার্ডিং স্ট্যাটাস’ পরীক্ষা করা উচিত, যাতে গোপনে কেউ কল ডাইভার্ট করে রাখলে তা দ্রুত ধরে ফেলা যায়। এছাড়া ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাপগুলোতে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার পাশাপাশি ফোনে আসা ওটিপি, গোপন পিন বা পাসওয়ার্ডের তথ্য সবসময় নিজের কাছেই গোপন রাখতে হবে। সর্বোপরি, যেকোনো সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সচেতন নাগরিক হিসেবে এই আধুনিক সাইবার ফাঁদকে রুখে দেওয়া সম্ভব।