
আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা | ৮ জুন ২০২৬
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক তৈমুর ইসলামকে অবশেষে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। সোমবার (৮ জুন) রাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশ অনুযায়ী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তাকে কেএমপি থেকে প্রত্যাহার করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্কে জড়িত থাকার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তৈমুর ইসলামের বাড়ি খুলনা সদরের খানজাহান আলী সড়কে। তিনি খুলনাতেই পড়াশোনা করেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কেএমপিতে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠান দখলে সহযোগিতা করতে ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো, মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তৈমুর ইসলামের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি সংস্থা পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও)-এর একটি প্রতিবেদনে তৈমুর ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত বছর কেএমপি পর্যায়ে অনুসন্ধান শেষে তাঁকে অন্য ইউনিটে বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁকে ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ২৫ অক্টোবরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি সেই আদেশের বিরুদ্ধে আবেদন করেন। ১৮ নভেম্বর তাঁর আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। পরে ২৩ নভেম্বর ট্যুরিস্ট পুলিশে পদায়নের আদেশ বাতিল করে তাঁকে খুলনা রেঞ্জে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক আদেশ জারি হলেও তৈমুর ইসলাম কেএমপি ছাড়েননি। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ খুলনা রেঞ্জে বদলির আদেশও বাতিল করা হয়। ফলে দফায় দফায় বদলির নির্দেশ এলেও তিনি কেএমপিতেই বহাল ছিলেন। অবশেষে সোমবার রাতে নতুন আদেশে তাঁকে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মালিকানাধীন সাভানা ইকোরিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্কের জন্য জমি অধিগ্রহণে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে আলোচনায় আসেন তৈমুর ইসলাম। স্থানীয়দের দাবি, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের বৈরাগীরটোলা এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের তদারকির দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের মে মাসে জমি বিক্রি করা পরিবারগুলোর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ পরিবারই দাবি করেছিলেন যে তাঁদের বিভিন্নভাবে চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জমি বিক্রিতে বাধ্য করা হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই প্রক্রিয়ায় পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম সরাসরি ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে তৈমুর ইসলামের ব্যাপক প্রভাব ছিল। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশিত হলেও সে সময় দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য সামনে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তর তাঁকে কেএমপি থেকে সরিয়ে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।