
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের ইতিহাসবিদ ও এই বিষয়ের শিক্ষকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে যাকে এককভাবে কৃতিত্ব দেওয়া যায়, তিনি হলেন কালজয়ী জ্ঞানতাপস অধ্যাপক কে আলী। বর্তমান সময়ে যারা ইতিহাস নিয়ে নিবিড় গবেষণা করছেন কিংবা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাদের ছাত্রজীবনে অধ্যাপক কে আলীর লেখা বইয়ের পাতা ওল্টাতে হয়নি অথবা তার ঐতিহাসিক দর্শনে অনুপ্রাণিত হতে হয়নি—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। গতানুগতিক ইতিহাসচর্চাকে একঘেয়ে ও প্রাণহীন রুক্ষতার বৃত্ত থেকে মুক্ত করে এক জীবন্ত রূপ দেওয়াই ছিল এই গুণী মানুষের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কৃতিত্ব। তার লেখনীর সহজাত ও প্রাণবন্ত ভাষার গুণে একেকটি তথ্যসমৃদ্ধ গ্রন্থ কেবল ইতিহাসের খতিয়ান থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল রসোত্তীর্ণ সাহিত্যে। প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে রেখে সম্পূর্ণ নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করার এক বিরল গুণ তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সহকর্মী ও গবেষকদের মতে, তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন; কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার্থীদের সামনে সামান্যতম ভুল তথ্য উপস্থাপন করাও এক ধরনের ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।
ইতিহাসের এই মহান শিক্ষকের শিকড় প্রোথিত ছিল আমাদের এই অঞ্চলেই। তিনি খুলনার ঐতিহ্যবাহী ডুমুরিয়া উপজেলার কাগুজীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বর্ণিল শিক্ষকতা জীবনের গৌরবময় অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল খুলনার দৌলতপুরের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ বি এল কলেজে। এই স্বনামধন্য কলেজে ইতিহাসের পাঠদান করাকালীন তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন যে, তৎকালীন সময়ে বাংলা ভাষায় মানসম্মত ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের বড্ড অভাব রয়েছে। সেই তাড়না থেকেই বি এল কলেজে থাকাবস্থায় তিনি রচনা শুরু করেন তার অবিসংবাদিত গ্রন্থ ‘ইসলামের ইতিহাস’। এটি মূলত তার নিজের লেখা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ইংরেজি বই ‘এ স্টাডি অব ইসলামিক হিস্ট্রি’-এর একটি চমৎকার বাংলা সংস্করণ। এই বইটির গ্রহণযোগ্যতা কেবল দেশের সীমানাতেই আটকে ছিল না, বরং গত শতাব্দীর শেষভাগে এসে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তানের বহু খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চতর সিলেবাসে এটি পাঠ্য তালিকার শীর্ষে অবস্থান করত। সমগ্র জীবনে শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে বেছে নেওয়া এই ব্যক্তিত্ব দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য কলেজে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন শেষে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজের উপাধ্যক্ষ বা ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তিনি একজন দূরদর্শী সমাজচিন্তক ও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। শিক্ষকতা করলেও তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আদর্শ ও কর্মজীবনকে গভীরভাবে অনুসরণ করতেন। পিসি রায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ব্যবসার মাধ্যমেই দেশের মানুষের সত্যিকারের ভাগ্য পরিবর্তন এবং নতুন কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এই ভাবনা থেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘কে আলী পাবলিকেশন্স’ ও ‘কাগুজী মুদ্রায়ণ’ নামের দুটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মূলত তার নিজের লেখা বইগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই প্রকাশনাটি পরিচালিত হলেও, তার জীবদ্দশাতেই এটি দেশের অন্যতম নেতৃস্থানীয় একটি প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে বৈষয়িক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। শুধু বড়দের জন্য তাত্ত্বিক বই লেখাই নয়, ছোটদের কোমল মনের উপযোগী করে তার লেখা গল্পগ্রন্থ ‘একটি আরব শিশুর কাহিনী’ পাঠকসমাজে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর পাশাপাশি প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন ‘আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের কর্ম ও জীবন’ নামক একটি অনবদ্য জীবনীগ্রন্থ।
একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে অধ্যাপক কে আলীর সময়নিষ্ঠা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল সমসাময়িক সবার জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রতিটি কাজ সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক সম্পন্ন করার নীতিতে বিশ্বাসী এই মানুষটি তার সহকর্মী ও পরিচিতজনদের সবসময় সময়ের মূল্য দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি বলতেন, সময়ের সঠিক মূল্যায়ন না করলে ব্যক্তিজীবনের যেমন কোনো উন্নতি সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরা থেকে যায়। ইতিহাস নিয়ে তার নিজস্ব একটি গভীর দর্শন ছিল। তিনি প্রায়ই বলতেন, নিজের দেশ, জাতি কিংবা স্বীয় জনপদের ইতিহাসকে গভীরভাবে না জানলে কোনো মানুষের পক্ষেই নিজেকে সত্যিকারভাবে চেনা সম্ভব নয়। আত্মান্বেষার মূল চাবিকাঠিই হলো ইতিহাস পাঠ করা। ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না’—এই চিরন্তন সত্যকে মেনে নিয়েও তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আমাদের দেশের শাসকদের উচিত তাদের পূর্বসূরিদের ইতিহাস আরও বেশি করে জানা, যা তাদের সমসাময়িক ভুলত্রুটি ও ঐতিহাসিক ভ্রান্তিগুলো এড়াতে দারুণভাবে সহায়তা করবে।
নিজের দীর্ঘ ও কর্মমুখর জীবনে তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক অমূল্য গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। তার কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর মধ্যে ‘মুসলমানদের ইতিহাস’, ‘ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাস’, ‘পাক-ভারতের ইতিহাস’, ‘মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাস’, ‘মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস’, ‘আধুনিক ইউরোপের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’ এবং ‘হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’ অন্যতম। সারা দেশের শিক্ষার্থী ও সুধীজনদের কাছে যিনি ‘অধ্যাপক কে আলী’ নামে এক নামে পরিচিত ছিলেন, তার পারিবারিক পূর্ণ নাম ছিল কাওসার আলী। ১৯৯৯ সালের ৬ আগস্ট ৮২ বছর বয়সে দেশের ইতিহাসচর্চার এই দেদীপ্যমান প্রাণপুরুষ পরলোকগমন করেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে বেঁচে না থাকলেও, তার নিজস্ব অনন্য লিখনশৈলী ও রেখে যাওয়া সৃষ্টিসম্ভারের মাধ্যমে এদেশের প্রতিটি ইতিহাস গবেষক ও মুক্তমনা মানুষের অন্তরে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবেন।