
বাংলা সাহিত্যের দিগন্তবিস্তারী আকাশে যে কজন নক্ষত্র আপন মহিমায় ভাস্বর, জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান তাদের মধ্যে অন্যতম। একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক এবং প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি নিজেকে উন্নীত করেছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯২২ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন যশোর ও বর্তমান মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহান ব্যক্তিত্বের জীবন ছিল জ্ঞান ও সৃষ্টির এক বিশাল ক্যানভাস। শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখা সৈয়দ আলী আহসানের প্রথম সৃষ্টিশীল প্রকাশ ঘটে ১৯৩৭ সালে আরমানিটোলা বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন। সে সময় স্কুল ম্যাগাজিনে তার ‘দ্য রোজ’ নামক একটি ইংরেজি কবিতা প্রকাশিত হয়, যা ছিল পরবর্তীকালে তার বিশ্বসাহিত্যে বিচরণ ও গভীর কবিত্ব শক্তির এক আগাম বার্তা।
উচ্চশিক্ষার আঙিনায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে অল ইন্ডিয়া রেডিও ও রেডিও পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে আসীন করে। পরবর্তীতে ১৯৬০ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক স্তরেও তার অবদান অনস্বীকার্য; তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বসাহিত্যে তার গ্রহণযোগ্যতা এতোটাই ছিল যে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি সুইডেনের নোবেল কমিটির সাহিত্য শাখার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার বিরল সম্মান অর্জন করেন।
সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন ঐতিহ্য সচেতন এক আধুনিক কবি। তার কাব্যভাবনায় একদিকে যেমন মূর্ত হয়েছে ইসলামি ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনা, অন্যদিকে তেমনি সমাজতান্ত্রিক ধারণা ও লেনিনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে গভীর প্রজ্ঞায়। তার কবিতায় দেশপ্রীতি ও সৌন্দর্যবোধের এক সুনিপুণ মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। ‘অনেক আকাশ’, ‘একক সন্ধ্যায় বসন্ত’, ‘সহসা সচকিত’ কিংবা ‘সমুদ্রেই যাব’—এর মতো কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে বাংলা কবিতার এক স্বতন্ত্র স্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কেবল মৌলিক সাহিত্যই নয়, অনুবাদ সাহিত্যেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ কিংবা ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার সফল রূপান্তরের পাশাপাশি তিনি আল্লামা ইকবাল ও টি এস ইলিয়টের কবিতার অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এছাড়া মধ্যযুগের কবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ সম্পাদনা করে তিনি বাংলা সাহিত্যের গবেষণার ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সৈয়দ আলী আহসানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোতে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একজন একনিষ্ঠ শব্দসৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন। ‘চেনাকণ্ঠ’ ছদ্মনামে তার বলিষ্ঠ উচ্চারণ তখন মুক্তিকামী মানুষকে জুগিয়েছে সাহস ও অনুপ্রেরণা। জাতীয় জীবনের এক অনন্য অর্জনেও তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়, কারণ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের ইংরেজি অনুবাদটি তার হাতেই সম্পন্ন হয়েছে, যা বর্তমানে সরকারি ভাষান্তর হিসেবে স্বীকৃত। শিশুতোষ সাহিত্য ও আত্মজীবনী ‘আমার সাক্ষ্য’ রচনার মাধ্যমে তিনি তার সৃজনশীলতার বহুমুখিতা প্রমাণ করেছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবন ও জ্ঞানসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮৩ সালে একুশে পদক এবং ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন তিনি। সরকার তাকে ১৯৮৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে বরণ করে নেয় এবং একই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ২০০২ সালের ২৫ জুলাই এই মহান মনীষী ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সৈয়দ আলী আহসান আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া বিশাল সাহিত্যসম্ভার এবং শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার অবদান তাকে চিরকাল বাঙালি জাতির হৃদয়ে অম্লান করে রাখবে।