1. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
  2. khulnarprotichchobi@gmail.com : khulnarprotichchob :
  3. shobuj.khulna@gmail.com : al masum Shobuj : al masum Shobuj
ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়: সেলুলয়েডের রূপকথা ও জহির রায়হানের সেই অসমাপ্ত ছবির ‘বনানী চৌধুরী’ - khulnarprotichchobi
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ৯ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| শরৎকাল| বৃহস্পতিবার| সকাল ১০:৪৬|
শিরোনামঃ
খুলনায় সোহাগ পরিবহনের ধাক্কায় বাবা-ছেলের মৃত্যু, আইসিইউতে আরেকজন। খুলনা টিটিসিতে বিনা খরচে জাপানি ভাষা শিক্ষা কোর্সের উদ্বোধন খুলনায় আজমুল হত্যা মামলায় আরও দুই আসামি গ্রেপ্তার আজমুল হত্যার বিচারের দাবিতে সোনাডাঙ্গায় শিক্ষার্থীদের অবরোধ,নগর প্রশাসকের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার আপন শহরে সমাধির জন্য দুই গজ মাটিও জুটল না মুঘল শেষ সম্রাট জাফরের সাইবার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলায় বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ৩৪ পদে নিয়োগ আজ থেকে নতুন দামে জ্বালানি তেল, লিটারে বাড়ল ২০ টাকা। দিঘলিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের পর্দা উঠল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গভীর রাতে যুবকের মৃত্যু, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে রহস্য।

ইতিহাসের বিস্মৃত অধ্যায়: সেলুলয়েডের রূপকথা ও জহির রায়হানের সেই অসমাপ্ত ছবির ‘বনানী চৌধুরী’

এস, এম আরাফাত আলী
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Spread the love

 

সময়ের নির্মম স্রোতে বিনোদন জগতের কত নামই তো হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। আজ সেলুলয়েডের রঙিন দুনিয়া আধুনিক প্রযুক্তির আলোয় ঝলমল করছে, প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন মুখ আর নতুন গল্প। কিন্তু আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে, যখন বাঙালি মুসলিম নারীদের জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়াই ছিল এক অলিখিত সামাজিক প্রাচীর, তখন রূপালী পর্দায় দাঁড়িয়ে যিনি সেই রক্ষণশীলতার শিকল ভেঙেছিলেন, তিনি বনানী চৌধুরী। তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, বরং আজকের প্রজন্মের অগণিত নারী অভিনয়শিল্পীর জন্য এক মসৃণ ও কণ্টকমুক্ত পথ তৈরি করে যাওয়া এক কালজয়ী সাহসী নারী। অথচ বর্তমানের ব্যস্ত সময়ে তাঁর এই অনন্য কীর্তি ও অবদানকে আমরা যেন অনেকটাই ভুলে বসে আছি।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, ১৯২৪ সালের মে মাসে জন্ম নেওয়া এই কালজয়ী অভিনেত্রীর পারিবারিক নাম ছিল আনোয়ারা চৌধুরী লিলি। তাঁর পৈতৃক শিকড় প্রোথিত ছিল মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার সোনাতুন্দী গ্রামে। তবে সরকারি চাকরিজীবী বাবার বদলির সুবাদে শৈশব থেকেই তাঁকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল ভারতের মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘী গ্রামের একটি সাধারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। খুব ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির প্রতি এক অন্যরকম টান অনুভব করতেন লিলি, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটত স্কুলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নাট্য উৎসবে। তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় মাত্র বারো বছর বয়সে, ১৯৩৬ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই কলকাতার ওয়াকফ কমিশনার রাজ্জাক চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। সাধারণত সেই যুগে বিয়ের পিঁড়িতে বসার পর কন্যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো নিভে গেলেও লিলির ক্ষেত্রে ঘটেছিল ব্যতিক্রম। তাঁর স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত উদার ও প্রগতিশীল মনের মানুষ। স্বামীর অকুন্ঠ সমর্থন ও উৎসাহে তিনি শুধু ঘরকন্নাই করেননি, বরং পড়াশোনা ও সাংস্কৃতিক চর্চা সমানতালে চালিয়ে যান। ফলশ্রুতিতে ১৯৪১ সালে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাসের পর একে একে আই.এ. এবং বি.এ. ডিগ্রীও অর্জন করেন তিনি।

স্কুল ও কলেজ জীবনের বিভিন্ন মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি ও নিখুঁত অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভাকে প্রতিনিয়ত শাণিত করেছেন। রূপালী পর্দার প্রতি তাঁর যে তীব্র অনুরাগ, তা পূর্ণতা পায় স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুলতান আহমদের মতো গুণী মানুষদের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৪৬ সালে তিনি যখন আনুষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন, তখন প্রখ্যাত পরিচালক গুণময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিশ বছর আগে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আনোয়ারা চৌধুরী লিলি থেকে তিনি রূপান্তরিত হন পর্দার ‘বনানী চৌধুরী’তে। যদিও নির্মাণ ও কারিগরি জটিলতায় তাঁর এই প্রথম চলচ্চিত্রটি আলোর মুখ দেখতে দীর্ঘ দুই বছর সময় নিয়েছিল, কিন্তু তার আগেই ১৯৪৭ সালে একে একে মুক্তি পায় তাঁর ‘অভিযোগ’, ‘পূর্বরাগ’ ও ‘تপোভঙ্গ’ (তপোভঙ্গ) নামের তিনটি জনপ্রিয় সিনেমা। এর মধ্যে সুশীল মজুমদার পরিচালিত ‘অভিযোগ’ সিনেমায় সুমিত্রা দেবীর সমান্তরালে অন্যতন প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে বনানী চৌধুরী রাতারাতি দর্শকের নজর কাড়েন। তাঁর মার্জিত রূপ, সংযত বাচনভঙ্গি এবং চরিত্রনির্ভর নিখুঁত অভিনয়শৈলী তাঁকে টলিউডের শীর্ষ সারিতে নিয়ে যায়।

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে পশ্চিমবাংলার চলচ্চিত্রে তিনি উপহার দেন একের পর এক কালজয়ী হিট সিনেমা। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিষের ধোঁয়া’, ‘মায়াজাল’ এবং ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ সিনেমাগুলো তৎকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন’ ছবিতে বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্য সেনের স্ত্রীর ভূমিকায় তাঁর অবিস্মরণীয় অভিনয় সারা বাংলায় বিপুল প্রশংসা কুড়ায়। প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি কেবল বাংলা সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; তাঁর অভিনয় দক্ষতা ছড়িয়ে পড়েছিল বলিউডেও। ‘কুছ নয়া’, ‘মণিকা’, ‘দীপক’ এবং ‘সবজ্ বাগ’ এর মতো বেশ কিছু হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের বহুমুখিতার প্রমাণ দেন। রূপালী পর্দার বাইরে কলকাতার আকাশবাণী বেতার এবং পেশাদার থিয়েটার মঞ্চেও ছিল তাঁর নিয়মিত ও দাপুটে পদচারণা। বিশেষ করে বেতারে তাঁর কণ্ঠের জাদুকরী আবেগ ও স্পষ্ট উচ্চারণ শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। পরবর্তীতে সত্তরের দশকে ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে মোড়লের গিন্নির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি চলচ্চিত্রে নিজের পরিপক্বতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

পশ্চিমবাংলায় নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করার পর এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়, যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও জহির রায়হানের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের স্বপ্নের সিনেমা ‘লেট দেয়ার বি লাইট’-এ তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে ইতিহাস বড়ই নির্মম; একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে ছবিটি অসমাপ্ত থেকে যায় এবং পরবর্তীতে জহির রায়হান নিখোঁজ হলে এই চলচ্চিত্রটি আর কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। সেলুলয়েডের এই দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা শেষে ১৯৯৫ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সাহসী নারী। কাকতালীয়ভাবে, যাঁর নামের সাথে জড়িয়ে ছিল ‘বনানী’ শব্দটি, মৃত্যুর পর ঢাকার বনানী কবরস্থানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি। আজকের আধুনিক চলচ্চিত্র শিল্পের যে ভিত, তা দাঁড়িয়ে আছে বনানী চৌধুরীর মতো অগ্রগামীদের আত্মত্যাগের ওপর। তাঁর প্রয়াণের এত বছর পরও, বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর দেখানো পথ ও অসামান্য অবদান বাঙালি চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে।

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025