
বিশ্ব ঐতিহ্য বাগেরহাটের ইতিহাস ও মধ্যযুগীয় জনকল্যাণমুখী ভাবনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন ষাট গম্বুজ মসজিদের পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘ঘোড়া দীঘি’। পঞ্চদশ শতকের অন্যতম সুফি সাধক ও দূরদর্শী শাসক হযরত উলুগ খানজাহান আলী (র.) এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর মিষ্টি পানির তীব্র সংকট নিরসনে যে কয়টি সুবিশাল জলাশয় খনন করেছিলেন, তার মধ্যে এই দীঘিটি অন্যতম। খানজাহান আলীর মাজারের প্রাপ্ত শিলালিপি অনুসারে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তিরোধান ঘটে, যা থেকে স্পষ্ট অনুমিত হয় যে এই দীঘির বয়স সাড়ে পাঁচ শতকেরও বেশি। তৎকালীন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এ নোনা অঞ্চলে সুপেয় পানির হাহাকার দূর করাই ছিল এই বৃহৎ দীঘিটি খননের মূল ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক উদ্দেশ্য।
এই দীঘির নামকরণ নিয়ে লোকমুখে ও ইতিহাসে বেশ কিছু কৌতুহলোদ্দীপক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। সর্বাধিক প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, হযরত খানজাহান আলী নিজে ঘোড়ায় চড়ে দীঘির সীমানা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন এবং তাঁর প্রিয় ঘোড়াটি যে স্থানে গিয়ে থেমে যায়, ততটুকুই দীঘির পরিমাপ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়। অন্যদিকে অনেকের মতে, দীঘির পাড়ে বহু ঘোড়া রাখা হতো এবং স্থানীয়ভাবে এখানে নিয়মিত ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা আয়োজিত হতো বলে এর নাম ঘোড়া দীঘি হয়েছে। আবার অন্য একটি লোকপ্রবাদ দাবি করে, দীঘিটি খননের পর প্রথমদিকে পানির কোনো সন্ধান না পাওয়ায় উলুগ খানজাহান অলৌকিক বিশ্বাস থেকে ঘোড়ায় চড়ে জলাশয়ের তলদেশে নেমেছিলেন, যার পরেই অলৌকিকভাবে বিশুদ্ধ পানি উঠতে শুরু করে।
ভৌগোলিক পরিমাপ ও অবকাঠামোর বিচারে পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘায়িত এই বিশাল জলাশয়টি লম্বায় প্রায় ১২৪৭ ফুট এবং চওড়ায় প্রায় ৭৪৯ ফুট বিস্তৃত। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানি সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তিহীন যুগে এই বিস্তৃত জলাশয়টি পুরো খলিফাবাদ রাজ্যের প্রধান প্রাকৃতিক প্রধান জলাধার হিসেবে কাজ করত। শুধু মিষ্টি পানি সংগ্রহই নয়, এই দীঘির সুপেয় পানির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন সময়ে দীঘিতে মিঠাপানির বিশেষ প্রজাতির কুমির লালন-পালন করার এক অনন্য প্রথা চালু করা হয়েছিল, যেন বহিরাগত বা স্থানীয়দের দ্বারা জলাশয়ের পানি দূষিত না হয়।
কালের পরিক্রমায় ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত এই দীঘিতে প্রাকৃতিকভাবে কুমিরের বংশবৃদ্ধি ও অবাধ বিচরণ বজায় ছিল, যা এই জলাশয়কে পরিবেশগতভাবেও এক বিশেষ পরিচিতি দান করেছিল। তৎকালীন সাধারণ মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি এমনকি পরবর্তী আধুনিক যুগেও বাগেরহাট পৌরশহরের বাসিন্দাদের সার্বিক বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের প্রধান এবং নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল এই ঐতিহাসিক ঘোড়া দীঘি। বর্তমানে এটি কেবল মিষ্টি পানির একটি সুপ্রাচীন জলাধারই নয়, বরং ষাট গম্বুজ মসজিদ পরিদর্শনে আসা বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের কাছে খানজাহানি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা ও স্থাপত্য কৌশলের এক অনন্য ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে আছে।