
খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের আঠারোবাকি নদীর অববাহিকায় এক সময় স্পন্দিত হতো এক বিশাল সাম্রাজ্যের হৃদয়স্পন্দন। নদীটির এক তীরে আজ থেকে প্রায় সার্ধশত বছর আগে ব্রিটিশ আমলে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল ঐতিহাসিক ঘাটভোগ জমিদার বাড়ি। চুন-সুরকির নিপুণ গাঁথুনি, দেয়াল জুড়ে ফুল-পাতা খচিত পোড়ামাটির নান্দনিক কারুকাজ আর রাজকীয় আভিজাত্যে ঘেরা এই বাড়িটি আজ এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি। কালের আবর্তে এবং দীর্ঘদিনের চরম রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমকালো সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এখন জরাজীর্ণ ভাঙা দেয়াল আর স্তূপীকৃত ধ্বংসাবশেষে রূপ নিয়েছে। এর ফলে ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হতে চলেছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। আড়াই একর জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ আজ কেবলই এক ভুতুড়ে রূপ নিয়ে নিস্প্রাণ দাঁড়িয়ে আছে, যা দেখলে আজ আর বোঝার কোনো উপায় নেই যে এখানেই এক সময় হাজার হাজার প্রজাদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো।
ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, এই রাজকীয় প্রাসাদের মূল প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী ও সুপরিচিত জমিদার কালীকান্ত চ্যাটার্জি, তবে মতান্তরে অনেক ঐতিহাসিক তাকে শ্রী মন্ত চ্যাটার্জি নামেও অভিহিত করে থাকেন। জমিদারেরা মূলত চার ভাই হলেও এই সুবিস্তৃত এবং প্রতাপশালী জমিদারির মূল কাণ্ডারি ও নিয়ন্ত্রক ছিলেন তিনি নিজেই। স্ত্রী, চার কন্যা এবং দুই পুত্র—অধিনদ্রু (মতান্তরে অধ্যাংদু) ও অমলেন্দু চ্যাটার্জিকে নিয়ে এই সুউচ্চ অট্টালিকায় ছিল তাঁর এক ভরা এবং প্রাণবন্ত সংসার। চ্যাটার্জি পরিবারের এই জমিদারির সীমানা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক এবং এর রাজকীয় প্রভাব ছিল বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের স্মৃতিচারণ ও লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী থেকে জানা যায়, প্রতি মাসে এই জমিদার বাড়ির বিশাল আঙিনায় প্রজাদের নিয়ে এক মহাসভার আয়োজন করা হতো। সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ প্রজারা তাদের অভাব, অভিযোগ, দুঃখ-দুর্দশা আর নানাবিধ আর্জি জমিদার বাবুর দরবারে পেশ করতেন এবং সেই অনুসারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। এককালের সেই আলো ঝলমলে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ, পেছনের চুন-সুরকির দেয়ালে টানানো পূর্বপুরুষদের সারি সারি তৈলচিত্র আর শোষণের সেই দিনগুলো আজ কেবলই দূর অতীতের রূপকথা।
দেশ বিভাগের পর এক চরম অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মুখে জমিদার পরিবারের সদস্যরা তাঁদের যাবতীয় বৈভব, রাজকীয় জাঁকজমক ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ফেলে রেখে রাতারাতি এদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। আর তাঁরা এই মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই মূলত এই ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের বিলুপ্তির করুণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য মতে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অরক্ষিত ভবনের মূল্যবান কাঠ, লোহার কড়ি, বরগা এবং দুষ্প্রাপ্য ঐতিহাসিক জিনিসপত্র একে একে খোয়া যেতে থাকে। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, ভবনের দেয়ালের প্রাচীন ইট ও ঐতিহ্যবাহী চুন-সুরকির গাঁথুনিও প্রতিদিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। প্রাসাদের পাশেই রাজকীয় জলছাপ নিয়ে কোনোমতে টিকে থাকা দুটি বিশাল দিঘিসদৃশ পুকুরও বর্তমানে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বারা বেদখল হয়ে আছে। বাড়ির প্রবেশদ্বারের জরাজীর্ণ ভেঙে পড়া রাস্তা আর ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালগুলো দেখে এখন আর কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে, এটি কোনো এক কালের পরাক্রমশালী শাসনকর্তাদের বাসস্থান ছিল। আঠারোবাকি নদীর তীরের এই অঞ্চলের ইতিহাস আর বিবর্তনের শেষ চিহ্নটুকুও আজ সম্পূর্ণ বেহাত ও ধ্বংস হওয়ার চূড়ান্ত প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।