
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার মোংলায় পর্যটকবাহী নৌযান চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের (ডিজি শিপিং) আকস্মিক অভিযান এবং মালামাল জব্দের প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা। এর ফলে শীতকালীন পর্যটন মৌসুমের ভরা সময়ে সুন্দরবন ভ্রমণে আসা হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। সোমবার ভোর থেকেই মোংলা ঘাটে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে শত শত জালি বোট ও ট্রলার। বনের গহিন থেকে লোকালয় পর্যন্ত কোথাও চিরচেনা ইঞ্জিনচালিত নৌযানের শব্দ নেই, নেই পর্যটকদের কোলাহল। মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে পড়া মোংলা বন্দর ও সংলগ্ন পর্যটন এলাকাগুলো এখন স্থবির হয়ে আছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক কঠোর অভিযান। মোংলা জালিবোট মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, কোনো প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গত রবিবার বিকেলে ডিজি শিপিং ও স্থানীয় প্রশাসন নৌযানগুলোতে অভিযান চালায়। অভিযানে পর্যটকদের বসার সোফা, চেয়ার ও নৌযানের ছাউনিসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভাঙচুর করা হয় এবং জোরপূর্বক ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন, তারা বাধা দিতে গেলে তাদের মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়েছে। মালিকপক্ষের মতে, লাইসেন্স ও সার্ভে করার নামে তাদের ওপর আকাশচুম্বী ব্যয়ের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যা পূরণ করা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে অসম্ভব। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ব্যবসায় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
এদিকে ধর্মঘটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সুন্দরবন ভ্রমণে আসা পর্যটকদের ওপর। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা মোংলায় এসে নৌযান না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। যশোর থেকে আসা স্বর্ণা আক্তার জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সুন্দরবন দেখার স্বপ্ন থাকলেও ঘাটে এসে তাদের ফিরে যেতে হচ্ছে। ঢাকার মিরপুর থেকে আসা আফরোজা বেগম এবং চুকনগর থেকে আসা ৫৪ জনের একটি দলও একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আসা অনেক পর্যটকই কোনো সমাধান না পেয়ে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের দাবি এবং প্রশাসনের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। মোংলা বন্দর যন্ত্রচালিত মাঝিমাল্লা সংঘের নেতা মো. সোহাগের মতে, ডিজি শিপিং এমন সব শর্ত দিচ্ছে যা বাস্তবায়ন করা স্থানীয় নৌযানগুলোর সামর্থ্যের বাইরে। অন্যদিকে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের পরিদর্শক মো. রাশেদুল আলম অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নৌযানের ওপরের বাড়তি অবকাঠামো অপসারণ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নৌযানের স্থায়িত্ব বজায় রাখা এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কাউকে হয়রানি করা তাদের লক্ষ্য নয়। করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজাদ কবিরও পর্যটক না আসার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে হয়রানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন মালিকরা, যার ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে গোটা সুন্দরবন পর্যটন খাত।