
হঠাৎ করে শরীরের কোনো একপাশ অবশ অনুভব করা কিংবা কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলাকে আমরা অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই সাময়িক অস্বস্তিই হতে পারে বড় কোনো বিপদের পূর্বাভাস, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘মিনি-স্ট্রোক’ বা ‘ওয়ার্নিং স্ট্রোক’ বলে অভিহিত করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক’ বা টিআইএ। মূলত মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে সাময়িকভাবে বিঘ্ন ঘটলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ব্রিটিশ চিকিৎসকদের মতে, এটি আসলে মস্তিষ্কের এক ধরণের হার্ট অ্যাটাক। এই লক্ষণগুলো সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি সেরে যায় বলে অনেকেই একে গুরুত্ব দেন না। তবে এই অবহেলাই ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোকের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
স্ট্রোকের এই প্রাথমিক সংকেতগুলো দ্রুত শনাক্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞরা ‘BE FAST’ নামক একটি জীবনদায়ী সূত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এই সূত্রের মাধ্যমে সহজেই লক্ষণগুলো মনে রাখা সম্ভব। যেমন, হঠাৎ করে শরীরের ভারসাম্য (Balance) হারিয়ে ফেলা এবং দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা চোখের (Eyes) সমস্যায় ভোগা মিনি-স্ট্রোকের প্রাথমিক ধাপ। এর পাশাপাশি যদি হাসতে গেলে মুখের (Face) একপাশ ঝুলে পড়ে কিংবা হাত (Arms) উপরে তুলতে গিয়ে অবশ হয়ে নিচে পড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে পরিস্থিতি গুরুতর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো কথা (Speech) জড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্টতা। এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দেওয়ামাত্র সময় (Time) নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করা উচিত, কারণ সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণই পারে স্থায়ী পক্ষাঘাত বা মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে।
মিনি-স্ট্রোকের চেনা উপসর্গের বাইরেও কিছু ভিন্ন লক্ষণ থাকতে পারে যা আমাদের সাধারণ অসুস্থতার সাথে বিভ্রান্ত করতে পারে। হঠাৎ তীব্র মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, খাবার গিলতে অস্বাভাবিক কষ্ট হওয়া কিংবা হঠাৎ করে মারাত্মক বিভ্রান্তিবোধ করাও মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যদিও সাধারণত ৫০ বছর ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি থাকে, তবে বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও স্ট্রোকের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে হৃদপিণ্ডে জন্মগত ছিদ্র থাকা কিংবা বয়স্কদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মিনি-স্ট্রোকের লক্ষণগুলো দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া মানেই বিপদ কেটে যাওয়া নয়, বরং এটি শরীরের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি চূড়ান্ত সতর্কতা। এটি মূলত জানান দেয় যে রক্তনালীতে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে যা যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো স্ট্রোকের রূপ নিতে পারে। তাই লক্ষণ সেরে যাওয়ার পর সুস্থ বোধ করলেও দ্রুত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো জরুরি। জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ই পারে একটি সাজানো জীবনকে চিরতরে পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে। আপনার সামান্য সচেতনতাই হতে পারে জীবন রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।