
আল মাসুম সবুজ
খুলনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম কাজী রকিবুল হক রিপন। নৃত্যশিল্পী, পরিচালক, প্রশিক্ষক ও গবেষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি দেশের নৃত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। শাস্ত্রীয় নৃত্যের সৌন্দর্য, দর্শন ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী হিসেবে।
খুলনায় জন্মগ্রহণকারী কাজী রকিবুল হক রিপনের নৃত্যজীবনের সূচনা হয় প্রখ্যাত নৃত্যগুরু উস্তাদ রাশেদ উদ্দিন তালুকদারের কাছে। তাঁর স্নেহময় তত্ত্বাবধানে সাত বছর নৃত্যের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি নৃত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন।
১৯৯২ সালে ভারত সরকারের আইসিসিআর (ICCR) বৃত্তি লাভের মাধ্যমে তিনি দিল্লির জাতীয় কথক নৃত্য প্রতিষ্ঠান ‘কথক কেন্দ্র’-এ উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। সেখানে গুরু রেবা বিদ্যার্থী, গুরু কৃষাণ মোহন মহারাজ এবং পরবর্তীতে কিংবদন্তি কথক সম্রাট পদ্মবিভূষণ পণ্ডিত বিরজু মহারাজের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় নিবিড় তালিম গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সংগীত, নাট্যকলার বিভিন্ন শাখায়ও প্রশিক্ষণ লাভ করেন।
নৃত্যজীবনে তিনি মহাকবি কালিদাসের সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে নির্মিত ‘মেঘদূতম’, ‘বিক্রমোর্বশীয়ম’, ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম’ এবং সুফি দর্শনভিত্তিক ‘রূহ-এ-ইশ্ক’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রযোজনায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় ও নৃত্য পরিবেশন করে প্রশংসিত হন।
২০০০ সালে দেশে ফিরে তিনি দেশের অন্যতম নৃত্যসংস্থা ‘নৃত্যাঞ্চল’-এ জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পাশাপাশি বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা)-এর জ্যেষ্ঠ নৃত্যশিক্ষক হিসেবেও দীর্ঘদিন কাজ করছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের লোকজ ও আদিবাসী নৃত্যধারা নিয়ে গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী শামিম আরা নীপা ও শিবলী মোহাম্মদের অনুপ্রেরণায় তিনি গবেষণা ও সৃজনশীল নৃত্যচর্চার পরিধি আরও বিস্তৃত করেন। তাঁর নির্দেশিত উল্লেখযোগ্য নৃত্যনাট্য ও প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে ‘আমি বাংলায় কথা কই’, ‘রবির আভায়’ এবং ‘নব আনন্দে জাগো’। এছাড়া দেশের একমাত্র সংগীতবিষয়ক পাক্ষিক পত্রিকা ‘সরগম’-এ দীর্ঘদিন ধরে নৃত্যবিষয়ক প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করে আসছেন।
বর্তমানে তিনি খুলনায় প্রতিষ্ঠিত নিজের নৃত্য একাডেমি ‘নৃত্যালয়’-এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের শাস্ত্রীয় ও সৃজনশীল নৃত্যশিক্ষা প্রদান করছেন। পাশাপাশি গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নৃত্যকলার বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
শুধু নৃত্যশিল্পী হিসেবেই নয়, অভিনয়শিল্পী হিসেবেও তিনি প্রশংসিত। ২০২৪ সালে বেঙ্গল ক্রিয়েটিভ প্রযোজিত এবং সৈয়দা নীগার বিনু পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘নোনা পানি’-তে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসা অর্জন করেন।
দীর্ঘ সাধনা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে কাজী রকিবুল হক রিপন আজ খুলনার গর্ব, দেশের নৃত্যাঙ্গনের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। নৃত্যের নান্দনিকতা, সৌন্দর্য ও দর্শনকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি এগিয়ে চলেছেন শিল্প ও সংস্কৃতির আলোকিত পথ ধরে।