
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, দেশে মাছের উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য নিরাপত্তা (ফুড সেফটি) নিশ্চিত না হলে সে উৎপাদনের কোনো বাস্তব মূল্য নেই। তিনি বলেন, একুয়াকালচারে উৎপাদিত মাছ যদি নিরাপদ না হয়, তবে সেটিকে প্রকৃত অর্থে মাছ বলা যায় না—এই বিষয়টি আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ফিশারিজ রিসার্চ ফোরাম (বিএফআরএফ)-এর উদ্যোগে আয়োজিত ১০ম দ্বিবার্ষিক মৎস্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। উপদেষ্টা বলেন, মাছ কেবল পেট ভরানোর খাদ্য নয়; এটি মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির অন্যতম উৎস। মাছ থেকে পাওয়া মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান চোখ, হাড় ও মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, বাঙালির মেধা বিকাশের পেছনেও মাছভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসের বড় অবদান রয়েছে।
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের বিষয়ে ফরিদা আখতার বলেন, বাংলাদেশ এখনো এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। বর্তমানে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে যেটুকু ব্যবহার হচ্ছে, সেখানেও নানা সমস্যা ও ঝুঁকি রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আর্টিসনাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের মাছ ধরার পদ্ধতি ভিন্ন হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারে ব্যবহৃত কিছু প্রযুক্তি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “সাগরে সাতবার গিয়ে একবার মাছ পাওয়ার পদ্ধতি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি একবারেই সব মাছ তুলে আনার জন্য সোনার (Sound Navigation and Ranging) প্রযুক্তির ব্যবহারও টেকসই হতে পারে না।” সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশে নিবন্ধিত ২২৩টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৭০টিতে সোনার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ওভারফিশিংয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, সরকার জাতীয় মৎস্য নীতিমালা হালনাগাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে মৎস্য আইনে কিছু সংস্কার আনা হয়েছে, তবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সংস্কার প্রয়োজন। দায়িত্বকালেই এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
ক্ষতিকর মাছ ধরার গিয়ার ব্যবহারের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পুরনো গিয়ার পরিবর্তন করে সেগুলোকে আরও ক্ষতিকর করে তোলা হচ্ছে; এমনকি কোথাও কোথাও ইলেকট্রিক শক ব্যবহার করেও মাছ ধরা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মৎস্যজীবীদের প্রণোদনার বিষয়েও বৈষম্যের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, কৃষি খাতে যে পরিমাণ সহায়তা দেওয়া হয়, সেই তুলনায় মৎস্যজীবীরা ন্যায্য প্রণোদনা পান না। নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় অনেক সময় তারা বাধ্য হয়ে নিয়ম ভাঙেন।
ইলিশ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন ও অভিবাসন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। “ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি আমাদের জাতীয় সম্পদ,”—বলেন তিনি। ডলফিন রক্ষার মতো ইলিশ সংরক্ষণকেও বৈশ্বিক আন্দোলনের অংশ হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। ইলিশের মাইগ্রেশন রুট সচল রাখতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. ফারুক-উল ইসলাম। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে এফএও প্রতিনিধি (অ্যাড-ইন্টারিম) ড. দিয়া সানো। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভাদ্রা এবং এসিআই পিএলসি’র গ্রুপ অ্যাডভাইজার ড. এফ. এইচ. আনসারী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএফআরএফ-এর সভাপতি ড. জোয়ার্দার ফরুক আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন মহাসচিব ড. মো. মনিরুল ইসলাম এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সহ-সভাপতি ড. মো. খালেদ কানক।