
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনাবসানে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বর্ষীয়ান এই নেত্রীর অন্তিম বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার সকালে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আগামী বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বাদ জোহর রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে বেগম জিয়ার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। দেশবরেণ্য এই নেত্রীর শেষ বিদায়ে অংশ নিতে সারা দেশের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা বেগম খালেদা জিয়া কেবল বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবরণের পর ১৯৮২ সালে এক কঠিন সময়ে তিনি বিএনপির হাল ধরেন। সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সেই সংগ্রামী পথচলায় তিনি কখনোই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার অটল অবস্থান তাকে ‘আপসহীন’ নেত্রীর মর্যদা এনে দেয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যেখানে অন্যান্য দল অংশ নিয়েছিল, সেখানে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে অনড় থেকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছিলেন।
তবে রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল তার জন্য অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। ২০০৮ পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তাকে অসংখ্য আইনি লড়াই ও ব্যক্তিগত শোকের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজ বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ, কারাবরণ এবং ছোট ছেলের অকাল মৃত্যুর মতো দুঃসহ যাতনা সহ্য করেও তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। ২০১৮ সালে কারান্তরীণ হওয়ার পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে না ফেরার দেশে নিয়ে গেল। চার দশকের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর। তার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো।