
খুলনা মহানগরের কোলাহল ছেড়ে খানিকটা দক্ষিণে গেলেই চোখে পড়ে এক বিশাল স্থাপত্য, যার শরীরজুড়ে মিশে আছে সাত বীরশ্রেষ্ঠের মহিমা। কিন্তু এই প্রশান্তির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে একাত্তরের সেই ভয়ঙ্কর বিভীষিকা, যখন ‘গল্লামারী’ নামটি শুনলে সাধারণ মানুষের রক্ত হিম হয়ে আসত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা নিরাপদ ও নির্জন কিলিং জোন হিসেবে বেছে নিয়েছিল রেডিও পাকিস্তানের তৎকালীন খুলনা কেন্দ্রটিকে। বর্তমানে যেখানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম চলে, সেই ভবনটিই ছিল একাত্তরের সেই কুখ্যাত কেন্দ্রবিন্দু। ময়ূর নদের নির্জনতা আর পাশের সুবিস্তৃত জলাভূমি ঘাতকদের জন্য লাশ গুম করার এক আদর্শ স্থানে পরিণত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস জুড়ে এই এলাকাটি ছিল কান্নার ভূমি। সে সময়কার রেডিও স্টেশন, যা আজ ‘শহীদ নজরুল ইসলাম ভবন’ হিসেবে পরিচিত, সেখানে ধরে নিয়ে আসা হতো বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। গবেষক অমল কুমার গাইনের ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: খুলনা জেলা’ বইয়ের ভাষ্যমতে, গল্লামারীতে প্রায় প্রতিদিন গণহত্যা চলত। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে ঘাতকরা কমপক্ষে ২৫০ বার বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালায়। যদিও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণার অভাব রয়েছে, তবুও ধারণা করা হয় অন্তত ১০ হাজার নিরপরাধ মানুষকে এখানে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আজ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে, একাত্তরে সেখানেই ছিল একটি প্রশস্ত খাল, যেখানে দিন-রাত ভেসে থাকত বাঙালিদের ছিন্নভিন্ন লাশ। হানাদারদের গানবোট যখন সেই খাল দিয়ে চলত, তখন নদীর পানি লাশের ভারে স্থবির হয়ে পড়ত।
দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকার পর ১৯৯০ সালে খুলনার সচেতন নাগরিক সমাজের চাপে প্রথম এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ এর উদ্বোধন করেন শহীদ পিতা আলতাউদ্দিন আহম্মদ। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে এবং ২০০৮ সালে ধাপে ধাপে এই স্মৃতিসৌধের আধুনিকায়ন করা হয়। স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমনের অনন্য নকশায় নির্মিত বর্তমান আধুনিক স্মৃতিসৌধটি আজ খুলনার অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মারক। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সাতটি সুউচ্চ স্তম্ভ আমাদের সাত বীরশ্রেষ্ঠের বীরত্বকে তুলে ধরে, আর মাঝখানের লাল সূর্যটি জানান দেয় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা।
ইতিহাসের সেই কালিমালিপ্ত দিনগুলোকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ২০১৬ সালে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন। শুধু তাই নয়, ক্যাম্পাসের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত সেই বিভীষিকাময় টর্চারসেলটিকেও ‘গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং ও সংস্কার কাজের মাধ্যমে এই স্থানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ও স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে। গল্লামারী তাই আজ কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় বীরত্ব এবং শোকের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।