
বাংলার সাহিত্যাকাশে যে কজন মনীষী যুক্তিবাদ, মানবতা এবং সমাজ সংস্কারকে নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, ডা. মোহাম্মদ লুৎফর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৮৮৯ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার পরনান্দুয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহৎ প্রাণ মানুষটি সারাজীবন মানুষের আত্মিক ও সামাজিক মুক্তির অন্বেষণ করে গেছেন। তার পিতা সরদার মইনউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন ইংরেজি অনুরাগী স্টেশন মাস্টার এবং মাতা শামসুন নাহার। চার ভাই ও এক বোনের সংসারে লুৎফর রহমান বেড়ে ওঠেন এক জ্ঞানতপস্বী পরিবেশে। পৈত্রিক নিবাস হাজীপুর গ্রামের এই কৃতি সন্তান পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শৈশব থেকেই ইংরেজি সাহিত্য ও উন্নত জীবনবোধের প্রতি আকৃষ্ট হন। নিজ গ্রামের নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি হলেও ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার টানে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখান থেকেই মূলত তার চিন্তাশীল সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
লুৎফর রহমানের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও সংঘাতমুখর। এফএ পড়াকালীন ১৯১৬ সালে সিরাজগঞ্জের ভিক্টোরিয়া হাইস্কুলে অ্যাংলো-পারসিয়ান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও আদর্শিক কারণে সেখানে বেশিদিন স্থির থাকতে পারেননি। স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে মতান্তরের জেরে ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তবে জীবনের শেষভাগে ১৯২০ সালে কলকাতায় গিয়ে তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। মূলত আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার লক্ষ্যেই তিনি এই পেশায় থিতু হয়েছিলেন। তার ব্যক্তিগত জীবনে হাজীপুরের আয়শা খাতুনের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়া ছিল এক স্থিরতার নাম, যার বাবা মোহাম্মদ বদরউদ্দীন ছিলেন রেলওয়ের একজন উচ্চপদস্থ ক্লার্ক। লুৎফর রহমান পেশাজীবী হিসেবে চিকিৎসক ও শিক্ষক হলেও তার মূল পরিচয়টি গড়ে ওঠে মুক্তবুদ্ধি চর্চার একজন বলিষ্ঠ প্রাবন্ধিক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে।
নারী জাগরণ ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে ডা. লুৎফর রহমান ছিলেন সময়ের চেয়ে অগ্রগামী একজন মানুষ। পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে আলোর পথ দেখাতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নারীতীর্থ’ নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান এবং নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে প্রকাশ করেছিলেন ‘নারীশক্তি’ নামক একটি অনন্য পত্রিকা। তার সাহিত্য সাধনা মূলত কবিতার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে তিনি কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধ রচনায় অধিক মনোযোগী হন। ১৯১৫ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। এরপর ‘সরলা’, ‘পথহারা’ ও ‘রায়হান’-এর মতো উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি সমাজের অসংগতি ও মানবিক প্রেমকে চিত্রিত করেন। তবে তার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় মেলে ‘মহৎজীবন’, ‘মানবজীবন’, ‘সত্যজীবন’, ‘উচ্চজীবন’ ও ‘যুবকজীবন’-এর মতো প্রবন্ধ গ্রন্থগুলোতে, যেখানে তিনি সহজবোধ্য অথচ গম্ভীর ভাষায় মানুষের চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের দর্শন প্রচার করেছেন। সওগাত ও প্রবাসীর মতো সে সময়ের প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোতে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।
জীবনব্যাপী জ্ঞানের আলো ছড়ানো এই মানুষটি শিশুতোষ সাহিত্যেও রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। ‘ছেলেদের মহত্ত্বকথা’, ‘ছেলেদের কারবালা’ এবং ‘রানী হেলেন’ তার শিশুতোষ রচনার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, যিনি সারাজীবন মানুষের সুস্বাস্থ্য ও মহৎ জীবনের জয়গান গেয়েছেন, তার নিজের শেষ বিদায় ছিল অত্যন্ত করুণ। চরম দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এই কালজয়ী সাহিত্যিক। আর্থিক অনটনের কারণে সুচিকিৎসা ছাড়াই ১৯৩৬ সালের ৩১ মার্চ মাত্র ৪৭ বছর বয়সে নিজ গ্রাম মাগুরার হাজিপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু বাংলার সাহিত্য ও সমাজ সংস্কারের ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া দর্শন আজও মুক্তমনা মানুষের কাছে পরম পাথেয়।