
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্য আর কীর্তিমান পুরুষদের গৌরবগাথা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং প্রাচীন খলিফাতাবাদ তথা বর্তমান বাগেরহাট জেলা এমনই এক অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের চাদরে আবৃত। এই অঞ্চলের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা খানজাহানী স্থাপত্যরীতির এক অনন্য ও কালজয়ী নিদর্শন হলো রণবিজয়পুর মসজিদ। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘দরিয়া খাঁ’র মসজিদ’ কিংবা ‘ফকিরবাড়ি মসজিদ’ নামেও সমধিক পরিচিত। স্থাপত্যশৈলীর নিখুঁত বুনন এবং ঐতিহাসিক মূল্যের বিচারে গবেষকদের ধারণা, মধ্যযুগের প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত খান জাহান আলীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহচর দরিয়া খাঁ ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই সুবিশাল ইমারতটি নির্মাণ করেন। কালের বিবর্তনে অনেক কিছুই বদলে গেলেও বাংলাদেশের সবচেয়ে সুসংরক্ষিত ও অক্ষত প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এই ঐতিহাসিক কীর্তিটি বাগেরহাট জেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে এবং বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার পূর্ব দিকে রণবিজয়পুর গ্রামের বুকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। নিপুণভাবে পোড়ানো লাল ইটের সমন্বয়ে গঠিত এই মসজিদের মূল আকর্ষণ হলো এর বিশাল আকৃতির একক গম্বুজটি। পুরো বাংলাদেশে যতগুলো এক গম্বুজ বিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে রণবিজয়পুর মসজিদটিই সবচেয়ে বড়। বাহ্যিক দিক থেকে মসজিদটির পরিমাপ প্রায় ৫৬ বর্গফুট এবং এর ভেতরের বর্গাকার কক্ষটির আয়তন প্রায় ৩৬ বর্গফুট। এই বিশাল কাঠামোটিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রাখতে এর চারপাশের দেওয়ালগুলো অস্বাভাবিক রকমের মোটা বা পুরু করে তৈরি করা হয়েছিল, যার পরিমাপ প্রায় ১০ ফুট বা ২.৭৪ মিটার।
খানজাহানী স্থাপত্যরীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সাদামাটা অথচ অত্যন্ত মজবুত নির্মাণশৈলী, যার নিখুঁত প্রতিফলন ঘটেছে এই মসজিদে। এর কিবলা বা পশ্চিম দেওয়াল ব্যতীত বাকি তিন দিকের প্রতিটিতে তিনটি করে দ্বি-কেন্দ্রিক সূচ্যগ্র খিলানপথ বা প্রবেশদ্বার রয়েছে। প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি পাশের মাঝখানের দরজাটি দুই পাশের দরজার তুলনায় কিছুটা বড় আকৃতির। মসজিদের অভ্যন্তরে পশ্চিম দেওয়ালে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অন্য দুটির চেয়ে বেশ বড় এবং প্রধান মিহরাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রধান মিহরাবের বাইরের দিকে একটি চমৎকার আয়তাকার অভিক্ষেপণ বা বর্ধিত অংশ দেখা যায়, যা ইমারতের বক্রাকৃতির কার্নিস বন্ধনীকে অতিক্রম করে ওপরের দিকে উঠে গেছে, তবে তা ছাদকে স্পর্শ করেনি। মসজিদের চার কোণায় থাকা মিনার বা বুরুজগুলো খানজাহানী ধারার চিরচেনা রূপ ধারণ করে গোলাকারভাবে নির্মিত হয়েছে। মিনারগুলোর নিচের অংশে কিছুটা অলংকরণ বা কারুকার্য থাকলেও ওপরের অংশটি সম্পূর্ণ সাদামাটা ও অলংকারহীন।
এই বিশাল ও নান্দনিক গম্বুজটিকে ছাদের ওপর টিকিয়ে রাখতে ভেতরে এক জটিল ও নিখুঁত প্রকৌশল বিদ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। নিচের বর্গাকার কক্ষটির ওপর গম্বুজটির ভার বহনের জন্য কোণগুলোতে চারটি অর্ধগম্বুজাকৃতির স্কুইঞ্চ এবং প্রতিটি দেওয়ালে দুটি করে ইটের পোস্তা বা পিলারের ওপর খিলান স্থাপন করে পুরো ছাদটিকে ধরে রাখা হয়েছে। একসময় এই মসজিদটি পোড়ামাটির চোখধাঁধানো ফলক বা টেরাকোটায় সুসজ্জিত ছিল। যদিও সময়ের আবর্তে এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই অলংকরণের সিংহভাগই আজ বিলীন হয়ে গেছে। তবে এখনো প্রবেশপথ, মিহরাবের চারপাশ, কার্নিস বন্ধনী এবং কোণার বুরুজগুলোর দিকে তাকালে সেই প্রাচীন অলংকরণের অবশিষ্টাংশ চোখে পড়ে। সূক্ষ্ম এই শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে গোলাপ নকশা, জালি নকশা, প্যাঁচানো ফুল ও লতা পাতার অবয়ব, হীরকাকার জ্যামিতিক নকশা এবং ঝুলন্ত শিকলের নকশাগুলো বিশেষভাবে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই অনন্য স্মারকটিকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বিগত শতাব্দীতেই। ১৯৬১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই ঐতিহাসিক রণবিজয়পুর মসজিদটিকে একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। খুলনা অঞ্চলের অন্যতম গৌরবময় এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার প্রকৌশলবিদ্যা, পোড়ামাটির শিল্প এবং মুসলিম ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজসহ প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য পর্যটক ও গবেষক এই প্রাঙ্গণে ভিড় করেন প্রাচীন বাংলার এই হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিনগুলোর সাক্ষী হতে।