
আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে আমাদের দিনের একটি বড় অংশ কাটাতে হয় ডেস্কে বা চেয়ারে বসে। তবে দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে কাজ করার কারণে অনেকের শরীরেই বাসা বাঁধছে নানা শারীরিক জটিলতা, যার মধ্যে পায়ে তীব্র ব্যথা, পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া এবং গোড়ালিতে অনবরত অস্বস্তির মতো সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। বিশেষ করে যাদের বয়স চল্লিশ বছর পার হয়েছে, তাদের মধ্যে এ ধরনের শারীরিক সমস্যা অনেক বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়ে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যথা, হঠাৎ ফুলে যাওয়া কিংবা পায়ে ঘন ঘন কালশিটে পড়ার মতো বিষয়গুলোকে সাধারণ ভেবে মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ অনেক সময় এই লক্ষণগুলো শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের পূর্বলক্ষণ বা প্রাথমিক সংকেত হিসেবে প্রকাশ পেয়ে থাকে। তাই এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে শুরুতেই সচেতন হওয়া এবং পায়ের প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসকরা বলছেন, পায়ের পেশির কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে, ব্যথা দূর করতে এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত কিছু হালকা শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। এই ধরনের সমস্যার সমাধান হিসেবে তারা অত্যন্ত সহজ এবং কার্যকরী একটি ব্যায়ামের পরামর্শ দিচ্ছেন, যার নাম ‘অ্যাঙ্কল বেন্ডিং’। এই ব্যায়ামটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য আলাদা কোনো বাড়তি সময় বা জিমে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, বরং অফিসে কাজের ফাঁকে নিজের বসার চেয়ারে বসেই এটি খুব সহজে অনুশীলন করা সম্ভব। ব্যায়ামটি করার নিয়মও বেশ সহজ; প্রথমে চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে মাথা, ঘাড় ও পিঠ একদম টানটান রাখতে হবে। এরপর দুই পা সামনের দিকে সোজা করে প্রসারিত করে দিতে হবে। এই অবস্থায় গভীর শ্বাস নিতে নিতে পায়ের গোড়ালি মাটিতে ঠেকিয়ে রেখে সামনের আঙুলগুলো যতটা সম্ভব উপরের দিকে তুলতে হবে। এর ঠিক পর মুহূর্তেই আবার ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে গোড়ালি উপরে তুলে দিয়ে পুরো পায়ের আঙুলগুলোর ওপর ভর দিতে হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে দুই ধাপ মিলিয়ে অন্তত ৫ থেকে ৭ বার এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রতিটি অবস্থানে যাওয়ার পর নিজেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন নিয়ম মেনে এই সহজ অ্যাঙ্কল বেন্ডিং ব্যায়ামটি করলে হাঁটুর দীর্ঘদিনের পুরনো ব্যথা অনেকটাই কমে আসে, কাফ মাসল বা পায়ের ডিমের তীব্র যন্ত্রণা দূর হয় এবং সায়াটিকার মতো মারাত্মক ব্যথার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব উপকার মেলে। তাছাড়া যারা পেশাগত কারণে দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে কাজ করেন, তাদের পায়ে রক্ত চলাচল কয়েক গুণ উন্নত হয় এবং পায়ের নিচের অংশের পেশির শক্তি ও নমনীয়তা বৃদ্ধি পায়। অনেক নারী বা ফ্যাশন সচেতন ব্যক্তিরা নিয়মিত হাই হিল জুতা ব্যবহার করার কারণে গোড়ালির দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় ভুগে থাকেন, তাদের জন্যও এই ব্যায়ামটি দারুণ এক নিরাময়ক হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এই ব্যায়ামটি সবার জন্য উপকারী হলেও যাদের হাঁটুতে সম্প্রতি বা অতীতে কোনো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বা সার্জারি হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ ও অনুমতি ছাড়া এই ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সবশেষে বলা যায়, সামান্য একটু সচেতনতা এবং নিয়মিত এই সহজ অনুশীলনের মাধ্যমে কর্মব্যস্ত মানুষগুলো তাদের পায়ের নানা জটিল সমস্যা ও ভবিষ্যতের বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি থেকে নিজেদের সহজেই মুক্ত রাখতে পারেন।