
রাতে একদম সুস্থ শরীরে ঘুমিয়েছিলেন, কিন্তু সকালবেলা চোখ খোলার পর হঠাৎ আবিষ্কার করলেন আপনার হাত নাড়ানোর কোনো উপায় নেই। কাঁধের তীব্র ব্যথা আর অসাড়তায় হাত তুলতে বা ঘোরাতে গেলেই যেন প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হয়। সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত এই যন্ত্রণাদায়ক শারীরিক সমস্যাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘অ্যাডেসিভ ক্যাপসুলাইটিস’ বা ‘অ্যাডহেসিভ ক্যাপসুলাইটিস’ বলা হলেও, এটি মূলত ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’ নামেই সবার কাছে বেশি পরিচিত। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষের ঘাড়, কাঁধের পেশি এবং অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, যে গুরুত্বপূর্ণ অস্থিসন্ধি বা জয়েন্টের দ্বারা আমাদের বাহু ও কাঁধ সংযুক্ত থাকে, সেই বিশেষ সন্ধিতে অবস্থিত হাড়, লিগামেন্ট এবং টেন্ডনগুলো এক ধরণের ক্যাপসুলের মতো নরম টিস্যু দ্বারা আবৃত থাকে। কোনো কারণে যদি সেই ক্যাপসুল বা চারপাশের টিস্যুগুলো ফুলে ওঠে এবং শক্ত হয়ে যায়, তখনই কাঁধের জয়েন্ট তার নমনীয়তা হারিয়ে ফ্রোজেন শোল্ডারে রূপ নেয়।
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই রোগের পেছনে নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক জটিলতা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে যাদের শরীরে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড কিংবা হৃদযন্ত্রের নানা রকম অসুখ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ফ্রোজেন শোল্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। এর বাইরেও যদি হুট করে শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিগড়ে যায় কিংবা অতীতে কাঁধে বা ঘাড়ে কোনো চোট-আঘাত লেগে থাকে, তবে সেখান থেকেও এই দীর্ঘমেয়াদি রোগের উৎপত্তি হতে পারে। এই তীব্র যন্ত্রণা ও পেশির জড়তা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত কিছু স্ট্রেচিং বা হালকা ব্যায়াম করা। তবে এ বিষয়ে প্রখ্যাত চিকিৎসক যুগল কারখুর সতর্ক করে বলেছেন, ফ্রোজেন শোল্ডারে আক্রান্ত রোগীদের ব্যায়াম নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। কারণ সঠিক কায়দা না জেনে ভুল পদ্ধতি অবলম্বন করলে বা ভুল ব্যায়াম বেছে নিলে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হবে এবং কাঁধের ভেতরের যন্ত্রণা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে। তাই সঠিক নিয়মে তিনটি বিশেষ স্ট্রেচিং অনুশীলনের মাধ্যমে এই অসহ্য কষ্ট থেকে স্থায়ী রেহাই পাওয়া সম্ভব।
ফ্রোজেন শোল্ডারের চিকিৎসায় প্রথম অত্যন্ত কার্যকরী ব্যায়ামটি হলো ‘পেন্ডুলাম স্ট্রেচ’। এই কসরতটি করার জন্য রোগীকে শরীরের ওপরের অংশ সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। এরপর একটি হাত ঘরের টেবিল বা চেয়ারের ওপর শক্ত করে রেখে ভর দিতে হবে এবং অন্য হাতটি একদম আলগা বা শিথিল করে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিতে হবে। এবার ঝুলন্ত হাতটিকে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং পরবর্তীতে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ধীরে ধীরে ছোট বৃত্তাকারে ঘোরাতে হবে। এভাবে এক হাত পাঁচবার ঘোরানো সম্পন্ন হলে, হাত বদল করে অন্য হাতটিও একইভাবে পাঁচবার ঘোরানোর অভ্যাস করতে হবে। দ্বিতীয় সহজ কৌশলটি হলো ‘ফিঙ্গার ওয়াক ওন দি ওয়াল’ বা দেওয়ালে আঙুল চালানো। এই অনুশীলনের ক্ষেত্রে রোগীকে একটি সোজা দেওয়ালের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে। এরপর এক হাত স্বাভাবিকভাবে ঝুলিয়ে রেখে অন্য হাতের তালু দেওয়ালের ওপর স্থাপন করতে হবে এবং হাতের আঙুলগুলোর সাহায্যে পিঁপড়ের মতো দেওয়াল বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি শেষ হলে হাত পরিবর্তন করে অপর হাতের আঙুলের সাহায্যেও একই পদ্ধতিতে দেওয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার অভ্যাস করতে হবে।
কাঁধের ভেতরের ক্যাপসুলকে সচল করতে তৃতীয় যে ব্যায়ামটি চমৎকার কাজ করে, তা হলো ‘টাওয়েল স্ট্রেচ’ বা তোয়ালের সাহায্যে টানটান ভাব তৈরি করা। এই ব্যায়ামটির জন্য ডান হাতে একটি মাঝারি আকারের পরিষ্কার তোয়ালে নিয়ে হাতটি শরীরের পেছনের দিকে মাথার ওপর তুলে ধরতে হবে। একই সময়ে বাম হাতটি দিয়ে পিঠের পেছন দিক থেকে তোয়ালের নিচের শেষ প্রান্তটি শক্ত করে ধরতে হবে। এরপর ডান হাতটি দিয়ে তোয়ালেটি যতটা সম্ভব ওপরের দিকে টানতে হবে এবং একই সাথে বাম হাতটি দিয়ে তোয়ালের অপর প্রান্ত নিচের দিকে স্ট্রেচ বা টেনে ধরতে হবে, যার ফলে দুই হাতেই একটি মৃদু টান বা চাপ অনুভূত হবে। এইভাবে অন্তত ৩০ সেকেন্ড অবস্থান করার পর হাত বদল করে বিপরীতভাবে একই প্রক্রিয়া পুনরায় করতে হবে। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত এই সঠিক স্ট্রেচিংগুলো অনুসরণের মাধ্যমে কাঁধের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফ্রোজেন শোল্ডারের অসহ্য যন্ত্রণা ও মাংসপেশির অসাড়তা থেকে চিরতরে মুক্তি মেলা সম্ভব।