
নাচের ছন্দ আর গবেষণার নিষ্ঠা—এই দুইয়ের যুগলবন্দীতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নৃত্যাঙ্গনে এক অনন্য নাম মোঃ এনামুল হক (বাচ্চু)। খুলনাকে কেন্দ্র করে এই নৃত্যের সাধক আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন শিল্পী, কোরিওগ্রাফার, শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে। তার কাছে নৃত্য কেবল পেশা নয়—এটি তার জীবন, তার শ্বাস, তার সাধনা।
১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট গোপালগঞ্জের মানিকহার গ্রামে জন্ম নেওয়া এনামুল হক বাচ্চুর শৈশব থেকেই ছিল তাল-লয়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। শান্ত গ্রাম থেকে নাচের জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে।
নৃত্যজীবনের শুরু থেকেই তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের কিংবদন্তি ওস্তাদদের কাছ থেকে দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তালিম নিয়েছেন। তাঁর গুরুজনদের মধ্যে রয়েছেন ওস্তাদ রাশেদ উদ্দিন তালুকদার, শিবলী মোহাম্মদ (কত্থক), সাজু আহম্মেদ (কত্থক), তামান্না রহমান (মনিপুরী), এবং ভরতনাট্যমে পণ্ডিত সি. ভি. চন্দ্রশেখর ও বেলায়েত হোসেন খান। মঞ্চব্যবহার ও কোরিওগ্রাফি শিখেছেন মমতা শঙ্করের কাছ থেকে। এই বিস্তৃত তালিম তাঁর শিল্পী-পরিচয়কে বহুমাত্রিক ও গভীর করেছে।
নৃত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে এনামুল হক বাচ্চু আজ এক প্রতিষ্ঠিত নাম। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি তাঁর দলকে নিয়ে পৌঁছে গেছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে:
এনামুল হক বাচ্চুর শিল্পী-জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বাংলাদেশের নিজস্ব নৃত্যঘরানা প্রতিষ্ঠার গবেষণা।
১. অষ্টক নৃত্য: তিনি চৈত্র সংক্রান্তির সাথে যুক্ত এই প্রাচীন লোকজ গীতি–নৃত্যনাট্যকে (শিবের গাজন, কৃষ্ণলীলা ইত্যাদি) বাংলাদেশের আদি লোকনৃত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। ‘নবান্ন’ তাঁর অষ্টক ভিত্তিক একটি বিখ্যাত নৃত্যনাট্য।
২. ঢালি বা লাঠি নৃত্য: এটিকে শুধু খেলা নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ নৃত্য হিসেবে দেখেন তিনি। অ্যাক্রোবেটিক কসরত, অঙ্গভঙ্গি ও হাস্যরসের এই নৃত্যকে তিনি বাংলাদেশের আরেকটি স্বতন্ত্র নৃত্যধারা হিসেবে প্রচার করছেন।
এই দুই নৃত্যকে তিনি তাঁর নিজস্ব দল “নৃত্যবিহার”-এর মাধ্যমে নিয়মিত পরিবেশন ও প্রচার করে চলেছেন।
লোকজ নৃত্যকে নতুন রূপে, নতুন ভাবনায় এবং নতুন গতিময়তায় বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করানোর যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা কেবল তাঁর নিজের নয়; এটি বাংলাদেশের নৃত্যঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার এক মহাযাত্রা।
[ খুলনার প্রতিচ্ছবি: আপনার কন্ঠস্বর]
ছবি : এ আই