
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে একটি নির্বাচনী জোট গঠিত হয়েছে, যেখানে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই জোট গঠনের সংবাদটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এনসিপি মূলত সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণ নেতৃত্ব দ্বারা গঠিত একটি দল। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। জামায়াত ও তাদের সমমনা আট দলের সঙ্গে এনসিপি এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) যুক্ত হওয়ায় জোটের সদস্য সংখ্যা এখন দশটিতে দাঁড়িয়েছে। জোটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস। এই ১০ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে, যেখানে এনসিপি প্রায় ৩০টি আসনে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এই জোট গঠন প্রক্রিয়াটি মসৃণ ছিল না। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বাঁধার সিদ্ধান্ত নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্তত ৩০ জন সদস্য এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেন। তাদের আপত্তির মূল কারণ ছিল জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ ও ইতিহাসের সঙ্গে এনসিপির নতুন ধারার রাজনীতির সংঘাত। তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত এই দলের একটি বড় অংশ মনে করে, এই সমঝোতা তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ও ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ সত্ত্বেও, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনী কৌশল এবং বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জোটের পথে এগিয়ে যায়।
জোট গঠনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, এই সমঝোতা শুধুমাত্র নির্বাচনী সহযোগিতার জন্য এবং এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংস্কারের বাস্তবায়ন ও বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী বিরোধী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা অপরিহার্য। এই জোটের মাধ্যমে তারা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং আসন সমঝোতার আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। এই ১০-দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করল, যেখানে তারা একদিকে যেমন ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দলগুলোকে একত্রিত করেছে, তেমনি অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তিকেও নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই সমঝোতা আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্যে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।