
চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্র সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ, ব্যালট পেপারে তার চূড়ান্ত সিলমোহর দিলেন সাধারণ মানুষ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত হওয়া সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত জাতীয় গণভোটের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার রাতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলে স্বাক্ষর করেন, যা শনিবার দুপুরে কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিকের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের পথে এক নতুন আইনি দিগন্ত উন্মোচিত হলো।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’–এর ১৬ ধারার (৩) উপ-ধারা মোতাবেক গত ১২ ফেব্রুয়ারি (২৯ মাঘ ১৪৩২) দেশজুড়ে এই ঐতিহাসিক ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রকাশিত গেজেটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের সাত কোটিরও বেশি ভোটার এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রাপ্ত ফলাফলে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট, যা সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবিত রূপরেখাকে বিশাল জনসমর্থন দান করেছে। মোট ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন ভোটার জুলাই বিপ্লবের চেতনার আলোকে সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে নিজেদের রায় দিয়েছেন। বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬টি।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত হিসাবে দেখা গেছে, গণভোটে সর্বমোট ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন নাগরিক তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে বাতিল হওয়া ভোটের সংখ্যা বাদ দিয়ে বৈধ ভোটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৬টি। বিপুল সংখ্যক ভোট বাতিল হওয়ার বিষয়টি (৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭টি) নির্বাচনে জনসচেতনতার প্রয়োজনীয়তা এবং ভোটদানের প্রক্রিয়ায় মানুষের গভীর আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই গণভোটের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রধান রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংবিধানের মৌলিক কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং সংসদীয় কাঠামোর আধুনিকায়নের মতো বিষয়গুলো এই সংস্কার প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল। খুলনার প্রতিচ্ছবির পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ এই গণভোটকে কেবল একটি নির্বাচন হিসেবে নয়, বরং আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইশতেহার হিসেবে গ্রহণ করেছেন। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে এখন এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা পাওয়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেল।