
দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সুফিবাদের বিকাশে হযরত খানজাহান আলী (র.) এর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির এক অভিজাত পরিবারে আকবর খাঁ ও আম্বিয়া বিবির কোল আলো করে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান পুরুষ। শৈশবে পিতার কাছে প্রারম্ভিক শিক্ষা সমাপ্তির পর দিল্লির প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর অধীনে কুরআন, হাদীস ও ইসলামি আইনশাস্ত্রে গভীর বুৎপত্তি লাভ করেন তিনি। সমসাময়িক সমরবিদ্যায় পারদর্শী হওয়ায় ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সামরিক বাহিনীতে সেনাপতি হিসেবে যোগ দেন এবং অসামান্য যোগ্যতার বলে দ্রুতই প্রধান সেনাপতির আসনে উন্নীত হন। পরবর্তীতে জাবিতান হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ নানা সামরিক অভিযানের ধারাবাহিকতায় ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি যশোরের বারবাজারে আগমন করেন এবং এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পীর নূর-কুতুবুল আলমের কন্যা সোনা বিবি এবং ধর্মান্তরিত মুসলিম রূপা বিবিকে (বিবি বেগনী) বিবাহ করেন, যাদের স্মরণে পরবর্তীতে সোনা মসজিদ ও বিবি বেগনী মসজিদ নির্মিত হয়। উলুঘ খান ও খান-ই-আজম উপাধিতে ভূষিত এই সুফি শাসক ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে অক্টোবর (৮৬৩ হিজরীর ২৬শে জিলহাজ্ব) ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে নামাজরত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে আয়োজিত বাৎসরিক ওরসে লাখো ভক্তের মিলনমেলা ঘটে।
খলিফাবাদ রাজ্যের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে হযরত খানজাহান আলী (র.) যেসকল অসামান্য কীর্তি রেখে গেছেন, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হলো প্রায় ২০০ একর আয়তনের সুবিশাল জলাশয়, যা ‘ঠাকুর দীঘি’ বা ‘খাঞ্জেলী দীঘি’ নামে পরিচিত। সাড়ে ছয়শত বছর আগে খননকৃত এই উন্মুক্ত জলাশয়ের পানির বিশুদ্ধতা রক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে তিনি স্বয়ং ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামের এক জোড়া মিষ্টি পানির কুমির জলাশয়ে অবমুক্ত করেন। শতাব্দী ধরে এই দীঘির কুমিরগুলো অত্যন্ত শান্ত ও মানববান্ধব আচরণের জন্য সুপরিচিত ছিল, যেখানে পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা কোনো ভয় ছাড়াই নিজ হাতে খাবার খাইয়ে দিতেন। তবে কালের পরিক্রমায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়ের মূল বংশধারার সর্বশেষ কুমিরটি মারা যায়। এর আগেই ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে সংগৃহীত কুমির এনে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও প্রতিকূল পরিবেশ ও খাদ্যাভাবের কারণে একে একে বেশিরভাগ কুমিরই মারা যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে অবশিষ্ট দুটির একটি মারা যাওয়ার পর দীঘিতে কেবল একটি কুমির একাকী অবস্থান করছিল।
সম্প্রতি এই জলাশয়ে ফাতেমা আক্তার নামের এক শিশু একাকী টিকে থাকা কুমিরটির আক্রমণে প্রাণ হারানোর পর নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ৩ জুন প্রশাসন ও বন্যপ্রাণী বিভাগের যৌথ উদ্যোগে মাজার দীঘির সর্বশেষ কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। এই স্থানান্তরের মাধ্যমে সুলতানি আমল থেকে চলে আসা সাড়ে ছয়শো বছরের এক সুপ্রাচীন অখণ্ড ঐতিহ্যে নজিরবিহীন বিরতি ঘটলো, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাস অনুরাগী দর্শনার্থীদের মাঝে এক গভীর শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। দরগাহের খাদেমদের একাংশের অব্যবস্থাপনা, দর্শনার্থীদের খাদ্য না পাওয়া এবং সার্বিক পরিবেশগত সংকটের মুখে আজ মাজার দীঘিটি কুমিরশূন্য হয়ে পড়লেও, মধ্যযুগীয় বাংলার এই মহান শাসক হযরত খানজাহান আলী (র.) এর অমর কীর্তি ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন অম্লান হয়ে থাকবে।