
জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের সমষ্টিই জীবন। আর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ভালো লাগা ও শখ। কারও শখ বই পড়া, কারও ভ্রমণ, কারও ছবি তোলা। আবার কেউ কেউ পুরোনো দিনের হারিয়ে যেতে বসা নানা নিদর্শন সংগ্রহ করে নিজের কাছে ধরে রাখেন সময়ের সাক্ষ্য।
তেমনই একজন মানুষ এম এম হাসান, ডাকনাম সোহেল। তবে খুলনার সংগ্রাহক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি ‘হাসান’ নামেই বেশি পরিচিত।
তার সংগ্রহের শুরুটা হয়েছিল ডাকটিকিট দিয়ে। ছোটবেলার সেই শখ আজ বিস্তৃত হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্মৃতির অসংখ্য নিদর্শনে। প্রায় দেড়শ দেশের ডাকটিকিট থেকে শুরু করে পুরোনো দলিল, চিঠি, মুদ্রা, বই, ছবি, সিনেমার রিল, নেগেটিভ, ডাক বিভাগের স্মারক—এমনকি ঢাকাইয়া মসলিনও রয়েছে তার সংগ্রহে।
এম এম হাসানের বাবা এ বি মিয়া আব্দুস শুকুর জিপিওতে চাকরি করতেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি জর্জ কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। বাবার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাতেই ছোটবেলায় ডাকটিকিট সংগ্রহের প্রতি হাসানের আগ্রহ তৈরি হয়।
ডাকটিকিট সংগ্রহের শুরুর সময়ের একটি ঘটনা এখনও তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
একদিন রেলওয়ে মাঠে ফুটবল খেলে বাড়ি ফিরছিলেন হাসান। পাওয়ার হাউস মোড়ে এক অপরিচিত ব্যক্তির হাতে একটি খাম দেখতে পান। খামের গায়ে লাগানো ডাকটিকিটটি তার নজর কাড়ে। ডাকটিকিটটি পাওয়ার আগ্রহে তিনি ওই ব্যক্তির পিছু নেন। এইচআরএইচ প্রিন্স আগাখান স্কুলের কাছে পৌঁছালে লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করেন, এতটা পথ তিনি কেন পিছু নিয়েছেন।
হাসান জানান, খামে লাগানো ডাকটিকিটটি তার প্রয়োজন।
লোকটি জানতে চান, তিনি ডাকটিকিট সংগ্রহ করেন কি না। হাসান ‘হ্যাঁ’ বলতেই সেই ব্যক্তি খাম থেকে ডাকটিকিটটি খুলে তাকে দিয়ে দেন।
ছোট্ট এই ঘটনাই যেন তার সংগ্রাহক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় স্মৃতি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ডাকটিকিট সংগ্রহের পরিধিও বাড়তে থাকে। বর্তমানে এম এম হাসানের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় দেড়শ দেশের ডাকটিকিট।
তার এই দীর্ঘদিনের সংগ্রহের স্বীকৃতিও এসেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কাছ থেকে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাকে সনদপত্র ও সম্মানসূচক ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছে।
একজন সংগ্রাহকের জন্য এ স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে তার দীর্ঘদিনের শখ ও শ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
হাসানের সংগ্রহশালায় ঢুকলেই চোখে পড়ে অসংখ্য বই। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় সাজানো রয়েছে পুরোনো ও দুর্লভ নানা বই ও সামগ্রী।
এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’-এর ১৩১৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণের একটি কপি। রয়েছে ১৯৫৫ সালের সরকারি ছুটির তালিকা, ১৯৬১ সালের পারিবারিক সার্টিফিকেট, পুরোনো পোস্টাল অর্ডার, ১২৭০ বঙ্গাব্দের দলিল, রূপালী ব্যাংকের পুরোনো স্লিপ, পুরোনো চিঠি, পূর্বপুরুষদের ছবি এবং ১৯৫১ সালের ক্যালেন্ডার।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন স্মারক ও কাগজপত্রও রয়েছে তার সংগ্রহে।
রয়েছে অসংখ্য দেশের কয়েন ও নোট, কার্ড, স্ট্যাম্প অ্যালবাম, বিভিন্ন ধরনের দেশীয় দিয়াশলাই, সিনেমার রিল, ফিল্ম, সাদাকালো ছবির নেগেটিভ, ডিভিডি, পুরোনো টর্চলাইটসহ নানা সামগ্রী।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহগুলোর একটি হলো ঢাকাইয়া মসলিন কাপড়।
খুলনা মহানগরীর পিকচার প্যালেস সিনেমা হলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো স্মৃতিও সংরক্ষণ করে রেখেছেন হাসান।
একসময় শিশুদের জন্য আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করতে সিনেমার টিকিটের সঙ্গে অতিরিক্ত একটি টিকিট বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করা হতো। সেই সময়ের একটি টিকিটও রয়েছে তার সংগ্রহশালায়।
একটি পুরোনো টিকিট হয়তো আজ সাধারণ মানুষের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একজন সংগ্রাহকের চোখে সেটি হয়ে উঠতে পারে একটি সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দলিল।
‘একাত্তরের চিঠি’ নামের একটি গ্রন্থে প্রকাশিত একটি চিঠির মূল কপিও হাসানের সংগ্রহে রয়েছে বলে তিনি জানান। চিঠিটি ‘বুলা’ নামের এক মেয়ের লেখা।
চিঠিটির মূল কপি কীভাবে তার সংগ্রহে এলো, সেটিও তার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। পুরোনো কাগজের দোকান থেকে চিঠিটি সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। পরে একই চিঠি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ায় মূল কপিটির উৎস ও যাত্রাপথ নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের সংগ্রহ ভবিষ্যতে গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হতে পারে।
হাসানের সংগ্রহে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডের স্ট্যাম্প অ্যালবাম। রয়েছে পুরোনো ভবনের ইট, বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রী এবং নানা সময়ের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন।
তার শ্বশুর বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার সময়ের একটি সাদাকালো ছবিও হাসানের সংগ্রহে রয়েছে।
প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে আলাদা একটি গল্প। তাই এসব সামগ্রী শুধু পুরোনো বস্তু নয়—প্রতিটি যেন অতীতের দিকে তাকানোর একটি জানালা।
হাসানের দীর্ঘ সংগ্রহযাত্রায় তার সহধর্মিণী মুর্শিদা ফেরদৌসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তার ঐকান্তিক সহযোগিতা ও পরিচর্যায় হাসানের শৈশবের শখ সময়ের সঙ্গে আরও বড় পরিসর পেয়েছে।
তাদের দুই কন্যা—লায়লাতুল হাসানা (রোজা) ও জান্নাতুল হাতাসিনা (রুপু)। লায়লাতুল হাসানা বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থী।
একটি শখকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখতে পরিবারের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, হাসানের জীবন তারও একটি উদাহরণ।
ইংরেজিতে ‘কালেক্টর’ বলতে সংগ্রাহক, আহরণকারী বা সঞ্চয়কারীকে বোঝানো হয়। কিন্তু একজন প্রকৃত সংগ্রাহকের কাজ শুধু জিনিস জমিয়ে রাখা নয়। পুরোনো কোনো বস্তু, দলিল, ছবি, চিঠি বা স্মারক যখন হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়, তখন তার সঙ্গে সংরক্ষিত হয় একটি সময়ের ইতিহাসও।
এই জায়গা থেকেই এম এম হাসানের সংগ্রহকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
তার সংগ্রহের অনেক উপাদান হয়তো বাজারমূল্যে খুব বেশি দামী নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য বিবেচনায় সেগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।
২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি খুলনায় ‘খুলনা কালেক্টরস শো’ নামে একটি সংগ্রহ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রদর্শনীতে ৩১ জন সংগ্রাহক অংশ নেন। তৎকালীন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মাহমুদ হোসেন প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।
প্রদর্শনীতে বিরল নোট, মসলিনসহ বিভিন্ন সংগ্রহ প্রদর্শিত হয়।
এ ধরনের আয়োজন খুলনার সংগ্রাহকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও তৈরি হতে পারে।
এম এম হাসান শুধু সংগ্রাহক নন, তিনি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত। নাটকে অভিনয় করেছেন। সংগীত নিজে চর্চা না করলেও সংগীতের প্রতি তার গভীর আগ্রহ রয়েছে।
খুলনা নাট্য নিকেতন, মির্জাপুর যুব সংঘ, খুলনা সাহিত্য পরিষদ, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ—খুলনা, খুলনা ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, অগ্রদূত মুক্ত দল, খুলনা কালেক্টর সোসাইটি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বাংলাদেশ বেতার খুলনাতেও নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি।
অর্থাৎ তার জীবনযাত্রার সঙ্গে সংগ্রহ, সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও সংস্কৃতিচর্চা পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
খুলনা শহর ও আশপাশের এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে যারা পুরোনো নথি, ছবি, মুদ্রা, ডাকটিকিট, বই ও ঐতিহাসিক সামগ্রী সংগ্রহ করছেন, তাদের অনেকের সংগ্রহই ভবিষ্যতের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন এসব সামগ্রী সংরক্ষণ করা কঠিন। যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকলে সময়ের সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে খুলনার সংগ্রাহকদের তালিকাভুক্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, প্রদর্শনীর সুযোগ এবং উপযুক্ত স্থান তৈরি করা প্রয়োজন।
সংগ্রাহকদের সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে তাদের কাজকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি নিয়মিত প্রদর্শনী আয়োজন এবং সংগ্রহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে খুলনার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এম এম হাসানের সংগ্রহের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একটি ছোট্ট শখ কীভাবে কয়েক দশকের পথ পেরিয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি বড় উদ্যোগে পরিণত হতে পারে।
ডাকটিকিট দিয়ে শুরু করা সেই সংগ্রহ আজ পৌঁছে গেছে মসলিন, পুরোনো দলিল, চিঠি, ছবি, মুদ্রা, বই, সিনেমার স্মারকসহ অসংখ্য নিদর্শনে।
হাসান আমাদের—খুলনারই একজন মানুষ। তার মতো সংগ্রাহকদের ব্যক্তিগত প্রয়াসকে উৎসাহিত করা শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়; এর মাধ্যমে আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও সম্মান জানাই।
খুলনার মানুষের উচিত এমন উদ্যোগের পাশে দাঁড়ানো। কারণ ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা একটি পুরোনো চিঠি, একটি ডাকটিকিট কিংবা একটি ছবি হয়তো আজ সামান্য মনে হতে পারে; কিন্তু আগামী প্রজন্মের কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অতীতকে জানার অমূল্য দলিল।
ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না। কখনো কখনো ইতিহাস লুকিয়ে থাকে একটি পুরোনো ডাকটিকিটে, বিবর্ণ ছবিতে, চিঠির কাগজে কিংবা মসলিনের একটি টুকরোয়। এম এম হাসানের সংগ্রহ সেই হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাসকেই যত্ন করে ধরে রাখার এক অনন্য প্রয়াস।
লেখক: নাসির আহমেদ
১৩ মে ২০২৬ খুলনা