
এস, এম আরাফাত আলী
যশোরের বকচর গ্রামের এক সাধারণ একতলা বাড়ির ছাদ থেকে শুরু হওয়া রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণের গল্পটি আজ আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। মহাকাশ চর্চার প্রথাগত কোনো শিক্ষা কিংবা আধুনিক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র অদম্য আত্মবিশ্বাস ও অসীম কৌতূহলকে পুঁজি করে একজন বাঙালি কীভাবে বিশ্বমানের গবেষণায় নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, তার সবচেয়ে প্রমান্য দৃষ্টান্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানী রাধাগোবিন্দ চন্দ্র। ১৮৭৮ সালের ১৬ই জুলাই যশোর জেলার বকচর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মহাকাশপ্রেমী মানুষটি কোনো অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি; এমনকি স্কুলজীবনের গণ্ডিও তিনি অতিক্রম করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও তাঁর মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন কখনো থমকে থাকেনি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় অক্ষয়কুমার দত্তের লেখা ‘ব্রহ্মাণ্ড কি প্রকাণ্ড’ প্রবন্ধটি পাঠ করার পর তাঁর মনে যে প্রশ্ন ও উন্মাদনার জন্ম হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বমানের গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত করে।
পরবর্তী জীবনে ১৯০০ সালের দিকে মাত্র ২২ বছর বয়সে যশোর কালেক্টরেট অফিসে খাজাঞ্চির চাকরি গ্রহণ করে দিনের বেলা কাজ আর রাতে আকাশ পর্যবেক্ষণে মনোনিবেশ করেন তিনি। সীমিত আয়ে নিজের জমি বিক্রি এবং বেতনের টাকা জমিয়ে ১৯১২ সালে ২৭৫ টাকায় কেনা মাত্র তিন ইঞ্চি ব্যাসের একটি ছোট্ট দূরবীন দিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন মহাকাশের অজানা রহস্য উন্মোচনের যাত্রা। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্য আসে ১৯১৮ সালের ৭ই জুন। সেদিন রাতে তিন ইঞ্চির দূরবীন দিয়েই তিনি আকাশের বুকে এক নয়া নক্ষত্র বা ‘নোভা’ আবিষ্কার করে সমগ্র এশিয়া মহাদেশকে চমকে দেন, যার আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছিল ‘নোভা অ্যাকুইলা থ্রি ১৯১৮’। বিশ্ব জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি হিসেবে এই অর্জনের পর তাঁর সাফল্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। পরবর্তীতে আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজার্ভার্স বা ‘অ্যাভসো’ তাঁকে তাদের সদস্য মনোনীত করে। ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি অ্যাভসোকে প্রায় ৩৭ হাজার ২১৫টি পরিবর্তনশীল তারার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাঠাতে সক্ষম হন, যা বিশ্বমানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ফ্রান্স সরকার ১৯২৮ সালে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ পদক ও উপাধিতে ভূষিত করে, যা তৎকালীন সময়ে কোনো বাঙালির জন্য ছিল প্রথম ঘটনা। এ ছাড়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর কাজের সুবিধার্থে সোয়া ছয় ইঞ্চি ব্যাসের একটি শক্তিশালী দূরবীন উপহার হিসেবে বকচরে তাঁর ঠিকানায় পাঠায়। অথচ যে প্রতিভাকে আমেরিকা, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলো পরম শ্রদ্ধায় মূল্যায়ন করেছে, নিজ জন্মভূমিতে তিনি পেয়েছেন চরম অবহেলা ও অপমান। পাকিস্তান আমলে স্থানীয় প্রশাসনের অশোভন আচরণ এবং কাস্টমসে তাঁর দূরবীন আটকে দেওয়ার মতো তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে তিনি অভিমান নিয়ে ভারতে পারি জমাতে বাধ্য হন। ১৯৭৫ সালে ভারতের বারাসাতে অর্থাভাব ও চিকিৎসাহীনতায় নীরবে-নিভৃতে মৃত্যুবরণ করেন মহাকাশের এই রূপকার। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পছন্দের দূরবীনটি ভবিষ্যৎ তরুণ বিজ্ঞানীদের ব্যবহারের জন্য দান করে যান, যা বর্তমানে ভারতের মানমন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে। দেশভাগের পর তাঁর বকচরের ঐতিহাসিক বাড়িটি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে রিকুইজিশন হয়ে যায় এবং ক্রমান্বয়ে তিনি নিজের জন্মস্থান থেকেই বিস্মৃত হতে থাকেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গবেষক ও লেখকের প্রচেষ্টায় বকচরের সেই বিস্মৃত নায়ক আবারও নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিতি পাচ্ছেন। যদিও ভারত, আমেরিকা ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে প্রতিবছর রাধাগোবিন্দের জন্মবার্ষিকী পালিত হয় এবং পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কাজ স্থান পায়, কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর বা স্থানিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর নামে কোনো স্মারক তৈরি না হওয়া আমাদের উদাসীনতারই প্রতীক। বকচরের নীরব আকাশ আর সেখানে একসময় নক্ষত্র গোনা সেই বিজ্ঞানসাধকের গল্প কেবল অতীত নয়, বরং তা আমাদের জন্য এক অমূল্য শিক্ষা ও আত্মোপলব্ধির নাম। খুলনার প্রতিচ্ছবির আয়োজনে মহাকাশ জয়ের এই কীর্তিমান বাঙালিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার মধ্য দিয়েই হয়তো পূরণ হবে তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতির প্রতি আমাদের ঋণ।