1. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
  2. khulnarprotichchobi@gmail.com : khulnarprotichchob :
  3. shobuj.khulna@gmail.com : al masum Shobuj : al masum Shobuj
বাঙালি চেতনার অবিনাশী কণ্ঠস্বর: কবি ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফরের জীবন ও কীর্তি - khulnarprotichchobi
২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| বর্ষাকাল| বুধবার| রাত ১:৫৯|
শিরোনামঃ
লবণচরায় কেএমপির নিজস্ব থানা উদ্বোধন জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন উপলক্ষে গ্রাফিতি প্রতিযোগিতা অনু‌ষ্ঠিত বটিয়াঘাটা উপজেলা মহিলাদলের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুন আক্তার মনির সুস্থতার কামনা বটিয়াঘাটা উপজেলা মহিলাদলের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুন আক্তার মনি হাসপাতালে ভর্তি, সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা মরহুম শফিউল বারী বাবুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে খুলনা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বিশেষ দোয়া মাহফিল বুধবার শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘গ্রেনেড বাবু’র ৩ সহযোগী গ্রেপ্তার খুলনা রেলস্টেশনে মার্বেল টাইলসের ওপর ঘুমিয়ে থাকা শিশুর ছবি নাড়া দিল হৃদয় খুলনা মহানগর যুবদলের ৩১ ওয়ার্ড কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত খুলনা রেঞ্জে ৩০ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

বাঙালি চেতনার অবিনাশী কণ্ঠস্বর: কবি ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফরের জীবন ও কীর্তি

এস, এম আরাফাত আলী
  • Update Time : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
Spread the love

 

বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আকাশে সিকান্দার আবু জাফর এক দেদীপ্যমান নক্ষত্র, যিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির চেতনাকে জাগ্রত করেছিলেন। ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন খুলনা জেলার এবং বর্তমান সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এই মহান ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল সৈয়দ আল্ হাশেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকান্দার। তাঁদের আদি নিবাস ছিল পাকিস্তানের পেশোয়ারে, যেখান থেকে তাঁর পিতামহ মাওলানা সৈয়দ আলম শাহ হাশেমী তেঁতুলিয়া গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। কৃষক ও ব্যবসায়ী পিতা সৈয়দ মঈনুদ্দীন হাশেমীর এই সন্তান শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি এক গভীর ও মায়াবী আকর্ষণ অনুভব করতেন, যা পরবর্তীতে তাঁকে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কাণ্ডারিতে পরিণত করে।

শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর রেখে সিকান্দার আবু জাফর স্থানীয় তালা বিদে ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৩৬ সালে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে কলকাতার বিখ্যাত রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতার মিলিটারি অ্যাকাউন্টস বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত জীবনের সূচনা হলেও, সিভিল সাপ্লাই অফিসের চাকরিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। তবে তাঁর ভেতরের সাংবাদিক ও সাহিত্যিক সত্ত্বাটি বেশিদিন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে আবদ্ধ থাকেনি। প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের ‘গ্লোব নিউজ এজেন্সী’-তে কাজ করার পর, ১৯৪১ সালে তিনি যুগস্রষ্টা কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পঞ্চাশের দশকে রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ ও দৈনিক মিল্লাত-এর মতো শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাসমূহে অত্যন্ত সুনামের সাথে সাংবাদিকতা করেন।

সাহিত্যিক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফরের যে খ্যাতি, তাঁর চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রসিদ্ধি ছিল একজন কিংবদন্তিতুল্য দূরদর্শী সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। ১৯৫৭ সালে তাঁর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে প্রগতিশীল বাংলা সাহিত্যধারার অগ্রগামী মুখপত্র মাসিক ‘সমকাল’ পত্রিকা, যা তিনি ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘সমকাল মুদ্রায়ণ’ নামে একটি আধুনিক ছাপাখানা ও ‘সমকাল প্রকাশনী’ নামে একটি প্রকাশনালয়। এই সমকাল পত্রিকাই ছিল ভারত বিভাগোত্তর কালে পূর্ব বাংলায় বাঙালি সংস্কৃতিচর্চা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। লেখার সাবধানী ও নৈর্ব্যক্তিক নির্বাচন, প্রতিভাবান তরুণ ও নতুন লেখকদের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান, অত্যন্ত মনোযোগী সম্পাদনা এবং চমৎকার মুদ্রণ পরিপাট্যের জন্য সমকাল তৎকালীন সময়ের নামী-দামী সকল কবি ও লেখকের কাছে একটি স্বপ্নের পত্রিকা হয়ে উঠেছিল, যা পূর্ব বঙ্গের সাহিত্য আন্দোলনে এক অভূতপূর্ব ও নতুন গতির সঞ্চার করেছিল।

সিকান্দার আবু জাফর গদ্য ও পদ্য উভয় রচনায় সমান দক্ষ হলেও, তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে একজন দ্রোহী ও দেশপ্রেমিক কবি হিসেবে। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার হীন প্রচেষ্টা চালায়, তখন তিনি এর প্রতিবাদে রাজপথে ও লেখনীর মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর রচিত কবিতা ও দেশপ্রেমের গানগুলো অবরুদ্ধ ও যুদ্ধরত বাঙালি জাতিকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁর রচিত “জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই…” গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিকামী মানুষের প্রধান রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল, যা প্রতিটি বাঙালির মনে সুখ ও সম্মানের সাথে বাঁচার এবং দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার এক অদম্য প্রেরণা জুগিয়েছিল। এই ঐতিহাসিক সমকাল পত্রিকাতেই তাঁর বিখ্যাত “বাংলা ছাড়ো” কবিতাটি প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি শোষকদের উদ্দেশ্যে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন নিজের আকাশ থেকে শকুনের ছায়া সরিয়ে নেওয়ার অমোঘ বাণী।

বহুমাত্রিক এই সাহিত্যিকের ঝুলিতে রয়েছে কালজয়ী সব সৃষ্টি, যার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ হিসেবে ‘প্রসন্ন প্রহর’, ‘তিমিরান্তিক’, ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ এবং ‘বৃশ্চিক লগ্ন’ অন্যতম। নাট্যকার হিসেবেও তিনি অনন্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন এবং তাঁর রচিত ‘সিরাজউদ্দৌলা’, ‘মহাকবি আলাউল’, ‘শকুন্ত উপাখ্যান’ ও ‘মাকড়সা’ নাটকগুলো ইতিহাস ও জাতীয়তাবাদের এক অনন্য রূপরেখা তৈরি করেছে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে তাঁর রচিত ‘পূরবী’, ‘নতুন সকাল’ ও ‘জয়ের পথে’ এবং ছোটগল্প ‘মাটি আর অশ্রু’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। একজন কুশলী অনুবাদক হিসেবেও তিনি বার্নাড মালামুডের ‘যাদুর কলস’, থর্নটন ওয়াইল্ডারের ‘সেন্ট লুইয়ের সেতু’ এবং ‘রুবাইয়াৎ: ওমর খৈয়াম’ অত্যন্ত সফলভাবে বাংলায় রূপান্তর করেন। সঙ্গীতে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল ‘মালব কৌশিক’। সাহিত্য ও নাটকে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার এক হাসপাতালে এই মহান সাধকের মহাপ্রয়াণ ঘটে এবং বনানী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক মজবুত ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025