
এস, এম আরাফাত আলী
বাংলা নাট্যসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও স্বাধীনতার সংগ্রাম—তিনটি ধারায় যার ভূমিকা অনবদ্য, তিনি খুলনার কৃতী সন্তান শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুলাই (৪ শ্রাবণ, ১২৯৯ বঙ্গাব্দ) খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান নাট্যকার ও দেশপ্রেমিক সাহিত্যিক। পিতা সত্যচরণ সেনগুপ্তের কর্মস্থল রংপুরে হওয়ায় তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের প্রারম্ভিক সময় কাটে সেখানে। সেখানেই তিনি সহপাঠী হিসেবে পান প্রখ্যাত বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে। ১৯০৫ সালে স্বদেশী ও বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বিদ্যালয় ত্যাগ করেন এবং বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯১১ সালে কলকাতার জাতীয় বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পাস করে বিএ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পাশাপাশি কটক মেডিক্যাল স্কুলে চিকিৎসাবিদ্যা এবং ময়মনসিংহে কবিরাজি শাস্ত্র শিক্ষার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ দেখা যায়।
কর্মজীবনের সূচনায় শচীন্দ্রনাথ একটি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করলেও দ্রুতই সাংবাদিকতার দিকে আকৃষ্ট হন। প্রখ্যাত শিক্ষক ও সাংবাদিক সখারাম গণেশ দেউস্করের সান্নিধ্যে থেকে তিনি সাংবাদিকতার পাঠ গ্রহণ করেন এবং ‘হিতবাদী’ পত্রিকায় সখারামের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ প্রতিষ্ঠিত ‘বিজলী’, ‘বৈকালী’ ও ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। পাশাপাশি ‘দৈনিক কৃষক’ ও ‘ভারত’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা সাংবাদিকতার অঙ্গনে বিশেষ সম্মান লাভ করে।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সবচেয়ে বড় পরিচিতি ও কৃতিত্ব গড়ে ওঠে নাট্যরচনা এবং মঞ্চাভিনয়ের জগতে। ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে একাধিক কালজয়ী নাটক উপহার দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নাটকগুলোর প্রধান ভিত্তি ছিল স্বাদেশিকতা, দেশাত্মবোধ, মানবতাবাদী চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক হিন্দু-মুসলিম মিলনের বাণী। তাঁর রচিত ঐতিহাসিক নাটকগুলোর মধ্যে ‘সিরাজদ্দৌলা’ সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এছাড়া ‘গৈরিক পতাকা’, ‘দেশের দাবি’, ‘ধাত্রী পান্না’, ‘রাষ্ট্রবিপ্লব’, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এবং ‘আর্তনাদ ও জয়নাদ’-এর মতো নাটকগুলো স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতি সচেতনতায় ঋদ্ধ। বিশেষ করে ১৯৪৬ সালে কলকাতার রঙ্গমঞ্চে প্রদর্শিত ‘রাষ্ট্রবিপ্লব’ নাটকটি তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ঐতিহাসিক নাটকের পাশাপাশ সামাজিক নাটকেও শচীন্দ্রনাথ তাঁর অসাধারণ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। মানবজীবন ও পারিবারিক জটিলতার রূপায়ণ ঘটেছিল তাঁর সামাজিক নাটকগুলোতে। তাঁর উল্লেখযোগ্য সামাজিক নাটকগুলোর মধ্যে ‘রক্তকমল’, ‘ঝড়ের রাতে’, ‘নার্সিংহোম’, ‘স্বামী-স্ত্রী’, ‘তটিনীর বিচার’, ‘মাটির মায়া’, ‘কাঁটা ও কমল’, ‘প্রলয়’ এবং ‘জননী’ অন্যতম। তিনি শুধু বড়দের নাটকেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, কিশোরদের উপযোগী নাটক, কালজয়ী প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী এবং নানা অনুবাদ গ্রন্থ রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
স্বাধীনতার পর শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত তৎকালীন বাংলা নাট্য আন্দোলনের সংগঠক ও নির্দেশক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। নানা উপদেশ, আলোচনা এবং নাট্য প্রযোজক ও অভিনয়শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি নতুন নাট্যধারাকে বেগবান করেছিলেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতার মাঝেও তিনি সর্বদা প্রীতি ও মৈত্রীর পথ অনুসরণের বার্তা দিয়েছেন। একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সাংস্কৃতিক দলের দলনেতা হিসেবে তিনি রাশিয়া, নরওয়ে, পোল্যান্ড, চীন ও সিংহল ভ্রমণ করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬১ সালের ৫ মার্চ এই কালজয়ী নাট্যকার ও দেশপ্রেমিক প্রয়াণ বরণ করেন। বাংলা নাট্যাঙ্গনে ও সাহিত্যাকাশে তাঁর অবদানের স্মৃতি চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।