
বাঙালির সাহিত্য ও মননে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে যত আলোচনা, যত গবেষণা আর স্মৃতিকথা রচিত হয়েছে, তার তুলনায় এক গভীর কুয়াশায় ঢাকা পড়ে রয়েছে তাঁর জীবনসঙ্গিনী মৃণালিনী দেবীর নাম। অথচ ইতিহাসের ৯ ডিসেম্বরের দিনটি কেবল দুটি মানুষের সামাজিক বন্ধনের মুহূর্ত ছিল না; এটি ছিল এমন এক সম্পর্কের সূচনা যা কবির ব্যক্তিজীবনকে যেমন স্থিতি দিয়েছিল, তেমনই এক নারীর সুপ্ত প্রতিভাকে করে রেখেছিল জনচক্ষুর অন্তরাল। দেবেন্দ্রনাথের কঠোর ব্রাহ্মধর্মীয় আচারের আবহে বাস করেও রবীন্দ্রনাথের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল তৎকালীন যশোর ও বর্তমান খুলনা অঞ্চলের সনাতন হিন্দু প্রথা মেনে। বরযাত্রী দল দক্ষিণডিহি না গেলেও জোড়াসাঁকোর অন্দরেই বসেছিল বিয়ের জাঁকজমকপূর্ণ আসর। অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায় ফুটে ওঠে সেই বিয়ের এক মধুর দৃশ্য, যেখানে পিসিমাদের ঠাট্টা-তামাশার মাঝে চিরচেনা গম্ভীর কবি রবিঠাকুর লজ্জায় মুখ গুঁজেও এক সহজ ও সাবলীল হাসিতে মেতে উঠেছিলেন। তবে এই পারিবারিক উৎসবের জাঁকজমকের আড়ালে একপ্রকার অলক্ষিতই থেকে গেছেন ভবতারিণী, যিনি বিয়ের পর ঠাকুরবাড়ির আভিজাত্যের ছাঁচে হয়ে উঠেছিলেন মৃণালিনী।
ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের পাতা ওল্টালেই কেবল কবির স্ত্রী পরিচয়ের বাইরে এক স্বতন্ত্র এবং সহজাত লেখিকা মৃণালিনীর সন্ধান মেলে। তাঁর গদ্য লেখার ধরণ ছিল এক কথায় চমৎকার; যার মধ্যে মিশে থাকত সূক্ষ্ম রসবোধ, ছন্দময় বর্ণনা এবং কথ্যভাষার এক সাবলীল প্রকাশ। বাবাকে লেখা চিঠির গভীর স্নেহ, বন্ধুদের কাছে পাঠানো পত্রের চপল রসিকতা কিংবা সত্যপ্রসাদকে লেখা সংসারের গুরুগম্ভীর হিসাব-নিকাশ—এই সবকিছুর মাঝেই লুকিয়ে ছিল তাঁর বহুমাত্রিক লেখনীর সুর। চারুবালাকে লেখা তাঁর একটি চিঠির সেই বিখ্যাত রসাত্মক অনুযোগ, যেখানে তিনি অন্য এক কন্যার ঘন চুলের প্রশংসা শুনে নিজের মাথায় ‘কুন্তলীন’ তেল মাখার কথা লিখেছিলেন, তা কেবল সাধারণ ঘরোয়া আলাপ ছিল না। এটি ছিল একজন প্রতিভাবান ও রুচিশীল রম্যরচনাকারের সার্থক স্বাক্ষর। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এই লেখনীর জাদুতে কতটা মুগ্ধ ছিলেন, তা সমসাময়িকদের স্মৃতিচারণ থেকেই স্পষ্ট হয়। কবি নাকি প্রতিদিন অধীর আগ্রহে স্ত্রীর চিঠির জন্য অপেক্ষা করতেন এবং তা হাতে পেলেই আনন্দে গুনগুন করে গান গেয়ে উঠতেন।
কবির স্ত্রী হওয়ার সামাজিক ভূমিকার বাইরে মৃণালিনী দেবীর মাঝে এক অসামান্য গদ্যকার, অনুবাদক কিংবা রম্যরচনাকার হয়ে ওঠার তীব্র সম্ভাবনা ছিল। মার্ক টোয়েনের বইয়ের পাতায় তাঁর নিমগ্ন থাকা কিংবা মহাভারতের অনুবাদের কাজে হাত দেওয়া ছিল সেই উচ্চমার্গীয় সাহিত্যিক চেতনারই অকাট্য প্রমাণ। কিন্তু তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, সময় এবং সর্বোপরি পরিবারের পক্ষ থেকে নারীর প্রতি নির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশার বেড়াজাল তাঁর এই কণ্ঠস্বরকে শেষ পর্যন্ত চিঠির চার দেয়ালের মাঝেই বন্দি করে রাখে। অমলা দাশের চমৎকার স্মৃতিকথা থেকে আমরা জানতে পারি যে, মৃণালিনী দেবীর অকাল প্রয়াণ কেবল রবীন্দ্রনাথের সংসারকেই তছনছ করে দেয়নি, বরং কবির ব্যক্তিসত্তার এক গভীরতম স্তম্ভকে চিরতরে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কবি তাঁর পরবর্তী জীবনের নানা লেখায় ও আত্মজীবনীমূলক মন্তব্যে বারেবারে বুঝিয়েছেন যে, মৃণালিনী ছিলেন তাঁর জীবনের এক নীরব শক্তি ও পরম আশ্রয়ের স্থল।
১৮৭৪ সালে জন্ম নেওয়া এই গুণী নারী মূলত যশোর জেলার দক্ষিণডিহির এক অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায়চৌধুরীর কন্যা ছিলেন। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর মাত্র নয় বছর বয়সে বাইশ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই করতে তাঁর আদি নাম ‘ভবতারিণী’ পরিবর্তন করে কবির প্রিয় নাম ‘নলিনী’র প্রতিশব্দ হিসেবে রাখা হয় ‘মৃণালিনী’। এই দম্পতির কোল আলো করে এসেছিল পাঁচ সন্তান—মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ, যাদের মধ্যে রেণুকা ও শমীন্দ্রনাথ অতি অল্প বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে। সন্তানের শোক এবং সংসারের নানা ঝড় সামলে ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটান মৃণালিনী দেবী। তাঁর অধিকাংশ চিঠি কালের গহ্বরে হারিয়ে গেলেও যে সামান্য নিদর্শন আজ অবশিষ্ট আছে, তা-ই প্রমাণ করে যে বাঙালির সাহিত্য ঐতিহ্যের এক বিরাট সম্ভাবনাকে সমাজ সেদিন চিনে উঠতে পারেনি। মৃণালিনী দেবী আজ বেঁচে থাকলে হয়তো সমৃদ্ধ হতো আমাদের সাহিত্যের এক ভিন্ন ও অনন্য ধারা।