
শীতের আগমনে ডুমুরিয়া, চুকনগর, শাহাপুর, শ্যামপুরসহ খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঐতিহ্যবাহী লেপ–তোশক কারখানাগুলোতে ব্যস্ততা বাড়লেও কারিগরদের মনে স্বস্তির চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি। কারণ—তুলা ও পলি ফোমসহ প্রধান কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এতে একদিকে উৎপাদনখরচ বেড়েছে, অন্যদিকে সিজন শেষ হলে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়তে হয় এসব ক্ষুদ্র কারিগরদের।
লেপ–তোশক তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তুলা ও পলি ফোম। কিন্তু গত কয়েক বছরে এসব উপকরণের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে কারিগরদের লাভ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। প্রতিটি লেপে লাগে ৬–৭ কেজি তুলা, যার কেজি দর কখনো ৫০ টাকা, কখনো ৭০ টাকাতেও পৌঁছে যায়। পলি ফোমের পাইকারি দাম বর্তমানে ৭০–৭৫ টাকা কেজি। তোশক তৈরির খরচ আরো বেশি। একটি তোশকে লাগে ১৫–২০ কেজি তুলা, খরচ দাঁড়ায় ১,৬০০ থেকে ২,২০০ টাকা। দাম বাড়লে লাভ কমে যায়; আর কম দামে বিক্রি করলে খরচও ওঠে না।
ডুমুরিয়া বাজারের কারিগর নুর ইসলাম (৪২) জানান—
“কাঁচামালের দাম বাড়লে পুরো হিসাবটাই গড়বড় হয়ে যায়। সিজনে কাজ বেশি থাকলেও লাভ থাকে না, আর অফ সিজনে তো কোনো কাজই পাওয়া যায় না।”
কারিগর মোজাহার আলী বলেন—
“সিজনে দিনে ৭–৮টি লেপ তৈরি করা যায়, অফ সিজনে দুই-তিনটিও হয় না। আয়ে টান পড়ে।”
মৌসুমে একজন কারিগরের মাসিক আয় যেখানে ২০–২৫ হাজার টাকা, অফ সিজনে তা নেমে আসে ১০ হাজার টাকায়। এতে পরিবার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
দাম–মানের টানাপড়েনে ক্রেতারাও চিন্তিত
বাজারে ছোট লেপের দাম ১,২০০ টাকা, বড় লেপ ১,৭০০ টাকা। মালিকরা কারিগরদের মজুরি দেন প্রতিটি লেপে মাত্র ২৫০ টাকা।
ক্রেতারা বলছেন, পণ্যের মান ভালো হলেও দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
হোস্টেল শিক্ষার্থী আশিক বলেন—
“তোশকের দাম গত বছরের তুলনায় একটু বেশি। তবে মান ভালো হওয়ায় কিনেছি।”
কারিগর মিলন বলেন—
“সারা বছর কাজ থাকে না। অন্তত অফ সিজনে যদি সুদমুক্ত ঋণ বা অন্য কাজের সুযোগ পেতাম, পরিবারের খরচ চালানো সহজ হতো।”
তাদের মতে, কাঁচামালের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুদমুক্ত ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ
এই তিন বিষয়ে সরকারি নজর বাড়লেই ঐতিহ্যবাহী লেপ–তোশক শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সাংবাদিক আজহারুল ইসলাম বলেন—
“এই লোকজ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা উচিত। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।”
শীত মৌসুমে ব্যস্ততা বাড়লেও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তা কমছে না ডুমুরিয়ার লেপ–তোশক কারিগরদের। ঐতিহ্যবাহী এই লোকজ শিল্পকে বাঁচাতে এখনই কারিগরদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন—নয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে কয়েকশ বছরের পুরনো একটি গ্রামীণ পেশা।