1. bditwork247@gmail.com : Zahid Hassan : Zahid Hassan
  2. khulnarprotichchobi@gmail.com : khulnarprotichchob :
  3. shobuj.khulna@gmail.com : al masum Shobuj : al masum Shobuj
ত্রাসের রাজত্বে সুন্দরবন, ২২ জেলের ঘরে জ্বলছে না চুলা: ‘দস্যুমুক্ত’ বনের ফিসফাস ও উপকূলের কান্না - khulnarprotichchobi
১৮ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| সোমবার| সন্ধ্যা ৬:৩১|
শিরোনামঃ
পূর্ব শত্রুতার জেরে কলাগাছ কেটে সাবাড় তরুণরাই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি: রকিবুল ইসলাম বকুল দিঘলিয়ায় শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কুরবানীর পশুর হাট, চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি বাগেরহাট জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সঙ্গে এম এ সালামের শুভেচ্ছা বিনিময় বটিয়াঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইপিআই কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ, মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে কৈফিয়ত তলব দিঘলিয়ার চার ইউনিয়নে জামায়াতের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত পকেটেই লুকিয়ে আছে গুপ্তচর: আপনার স্মার্টফোনের ক্যামেরা গোপনে চালু হচ্ছে না তো? ভুলবশত পোস্ট হওয়া ফেসবুক স্টোরি নিয়ে বিব্রত? জেনে নিন দ্রুত ছবি বা ভিডিও মুছে ফেলার সহজ কৌশল মরণঘাতী জাপানিজ এনসেফালাইটিসের হানা: বাংলাদেশে কি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা? সাধারণ জন্ডিস যখন ডেকে আনে চরম বিপদ: কখন হতে পারে প্রাণঘাতী লিভার ফেইলিউর

ত্রাসের রাজত্বে সুন্দরবন, ২২ জেলের ঘরে জ্বলছে না চুলা: ‘দস্যুমুক্ত’ বনের ফিসফাস ও উপকূলের কান্না

আল মাহফুজ শাওন
  • Update Time : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
Spread the love

 

সুন্দরবনের চিরচেনা শান্ত বাতাস এখন আর মৌয়াল বা বাওয়ালিদের মনে প্রশান্তি আনে না, বরং সেখানে মিশে আছে এক চাপা কান্না আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। যে নদী আর জঙ্গল উপকূলের লাখো মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন, সেই সুন্দরবনের গহীন অরণ্য আজ আবারও নিরীহ শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। অতি সম্প্রতি বনের বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে একসঙ্গে ২২ জন ভাগ্যবিড়ম্বিত জেলেকে দস্যুবাহিনী কর্তৃক অপহরণের ঘটনায় পুরো উপকূলীয় জনপদে নেমে এসেছে চরম আতঙ্ক, তীব্র ক্ষোভ আর গভীর অনিশ্চয়তা। অপহৃত এই মানুষগুলোর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে পরিবারগুলোর মাঝে কাটছে বিনিদ্র রজনী; অনেক দরিদ্র ঘরে দিনের পর দিন জ্বলছে না উনুন। স্বজন হারানো মা-বোনেদের আহাজারিতে সুন্দরবনের কোলের গ্রামগুলোর আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে উপকূলের সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই তাগিদ আর বড় প্রশ্ন—স্বাধীন দেশে কেবল দু’মুঠো ভাতের সন্ধানে বের হওয়া খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের কি কোনো ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই?

ইতিহাসের পাতা ও সরকারি নথিপত্র বলছে, দীর্ঘ ও ধারাবাহিক অভিযানের পর ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার পর জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ এবং বনাঞ্চলে এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ফিরে আসায় উপকূলের মানুষ আশার আলো দেখেছিলেন। তবে সেই শান্তি ও স্বস্তি যেন কর্পূরের মতো উবে যেতে শুরু করেছে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে। স্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো দাবি করছে, বনের গহীনে নতুন ও পুরোনো দস্যুবাহিনীগুলো ফের সংগঠিত হয়ে তাদের অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তার করছে। বর্তমানে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ১৬টি ডাকাত দল পুরোদমে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে উপকূলের ত্রাস হিসেবে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী এবং আসাবুর গ্রুপের নাম এখন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। বনের দুর্গম গোলপাতা জঙ্গল আর গোলকধাঁধার মতো নদীপথকে নিজেদের নিরাপদ দুর্গ বানিয়ে এরা সুযোগ বুঝে জেলেদের নৌকা ও ট্রলারে হানা দিচ্ছে এবং অস্ত্রের মুখে জেলেদের জিম্মি করে চড়া অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে। আর যারা এই চড়া মুক্তিপণ দিতে পারছে না, তাদের ওপর নামছে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন।

দস্যুদের এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের কালো ছায়া এখন আর শুধু জেলেপাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা গ্রাস করতে শুরু করেছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকেও। সাম্প্রতিক সময়ে বনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের কাছাকাছি পর্যটকবাহী ট্রলার কিংবা বিলাসবহুল রিসোর্টগুলোতে দস্যুদের ডাকাতির চেষ্টার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিয়াসীদের মাঝেও এক ধরনের তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি দানা বাঁধছে। এই খাতের ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার আমূল পরিবর্তন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে সুন্দরবনকেন্দ্রিক এই বিশাল অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্প এক মহা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যদিও এই অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আভিযানিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়েছে। দাপ্তরিক সূত্র মতে, গত দেড় বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন জোনে শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে অন্তত ৬১ জন দুর্ধর্ষ দস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, তাজা গোলাবারুদ ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে, উপকূলের ভুক্তভোগী মানুষ এখন আর শুধু অভিযানের পরিসংখ্যান বা ফাঁকা আশ্বাস শুনতে রাজি নয়; তারা চায় একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান। কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার অবহেলিত জেলে মো. মনিরুল ইসলাম নিজের যাপনচিত্র তুলে ধরে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, নদীতে না গেলে পেটে ভাত জোটে না। কিন্তু এখন নদীতে গেলেও বুক দুরুদুরু করে—নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে আবার জ্যান্ত ঘরে ফিরতে পারবো তো? আমাদের পাড়ার মোড়ে দাঁড়ালেই প্রতিদিন শোনা যায়, অমুককে ডাকাতরা ধরে নিয়ে গেছে।” প্রায় একই রকম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে দাকোপ উপজেলার সুতারখালি এলাকার জেলে অরিবিন্দু মণ্ডল বলেন, “সব গোছগাছ করে বুকে সাহস নিয়ে বনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু মনে মনে ভয় হয়, যদি ডাকাতরা ধরে নিয়ে যায় তবে মুক্তিপণের অত টাকা আমি কোথায় পাব? বন বিভাগ তো ঠিকই আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বনে যাওয়ার পাস-পারমিট দেয়, কিন্তু ডাকাতের হাত থেকে আমাদের বাঁচানোর কোনো দায় নেয় না। বাঘ, সাপ বা কুমিরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা কবিরাজের মাদুলি বা তাবিজ নিয়ে বনে যাই, কিন্তু এই রক্তচোষা ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচার মতো কোনো তাবিজ তো আমাদের কাছে নেই!”

উপকূলীয় অঞ্চলের ভুক্তভোগী জেলে ও সচেতন মহল মনে করছেন, সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ করতে হলে শুধু সাময়িক অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বনের প্রবেশ পথগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, স্থানীয় নদীনির্ভর জনগণের সাথে আইনশৃঙ্খলার বাহিনীদের গভীর সমন্বয় এবং নদীপথে সার্বক্ষণিক স্থায়ী টহল চৌকি বা সিকিউরিটি পোস্ট গড়ে তোলা। এই বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সুন্দরবন কেবল গাছপালা আর পশুপাখির কোনো সাধারণ অরণ্য নয়; এটি উপকূলের লাখো মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি এবং দেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। সেই সুন্দরবন যদি আবার দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তবে তা শুধু উপকূলের মানুষের জীবন হানির কারণ নয়, বরং পুরো দেশের সামগ্রিক সুরক্ষার জন্যই এক বড় অশনিসংকেত।”

অবশ্য উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন এক সংকটের কথা তুলে ধরে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানান, “দস্যুরা জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে—এমন খবর প্রায়ই আমাদের কানে আসে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ভুক্তভোগী জেলে বা তাদের পরিবারগুলো ভয়ে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করে না। আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকার কারণে প্রশাসনের পক্ষেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া বা দ্রুত অ্যাকশনে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করতে জেলেদেরও ভয়ডরহীনভাবে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।”

ঠিক এমন এক দমবন্ধ ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই, ‘বিপদমুক্ত নৌযাত্রা, জানমালের সুরক্ষা’—এই দৃঢ় প্রত্যয় ও স্লোগানকে সামনে রেখে দেশজুড়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হচ্ছে সপ্তাহব্যাপী ‘নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ’। নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের আয়োজনে বর্ণিল এই চলমান কর্মসূচিকে ঘিরে এখন দস্যু-উপদ্রুত উপকূলবাসীর মনে কেবল একটাই জ্বলন্ত প্রশ্ন—শুধুই কি প্রচার আর টেবিল-চেয়ারের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে এই সপ্তাহ শেষ হবে, নাকি সত্যিই এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সুন্দরবনকে আবার দস্যুমুক্ত করে খেটে খাওয়া মজুরদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে? উপকূলের কোটি মানুষের এখন একটাই শেষ মিনতি, শুধু কথার ফুলঝুরি নয়; সরকার ও প্রশাসনের বাস্তবসম্মত এবং কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে সুন্দরবনে আবারও সেই নিরাপদ ও শান্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক, যেন বুকভরা আশা নিয়ে নদীতে নামা মানুষগুলো অন্তত দিনশেষে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় আপনজনদের কোলে ফিরে আসার ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকু পায়।

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025