
সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনার সব সরকারি দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ বনদস্যুরা। বনের ওপর নির্ভরশীল অবহেলিত জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করার ধারা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, যার ফলে সমগ্র উপকূলীয় জনপদে এখন চরম আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। অতি সম্প্রতি সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা থেকে মুক্তিপণের দাবিতে আরও ৮ জন নিরীহ বনজীবীকে অপহরণের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে পশ্চিম সুন্দরবনের গহীনে এই সুপরিকল্পিত অপহরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সূত্রগুলোর দাবি, বনের নতুন ত্রাস হিসেবে পরিচিত ‘নানা ভাই ওরফে ডন’ এবং ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা দেশীয় ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে এই বনজীবীদের ট্রলার ও নৌকা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। এই গণ-অপহরণের ঘটনার পর অপহৃতদের পরিবারে চরম উদ্বেগ ও আকুলতা দেখা দিয়েছে।
অপহৃত এই ভাগ্যবিড়ম্বিত বনজীবীদের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, যাদের বড় একটি অংশ সাতক্ষীরার স্থানীয় বাসিন্দা। এদের মধ্যে রয়েছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জের মীরগাঙ এলাকার বারি তরফদারের ছেলে নজরুল তরফদার এবং আমির আলী গাজীর ছেলে আব্দুর রহমান। একই উপজেলার ছোট ভেটখালী এলাকা থেকে অপহৃত হয়েছেন ছবেদ আলী মোড়লের ছেলে আব্দুল হামিদ মোড়ল। এছাড়া আটুলিয়া ইউনিয়নের ভড়ভড়িয়া এলাকার আব্দুর রহিম গাজীর ছেলে আব্দুল আলিম গাজী, ইব্রাহিম গাজীর ছেলে হাবিবুর রহমান এবং শামসুর রহমান গাজীর ছেলে আনোয়ারুল ইসলামও দস্যুদের কবলে পড়েছেন। সাতক্ষীরার এই ৬ বাসিন্দার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী খুলনা জেলার কয়রা এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও শাহিনুর রহমান নামের আরও দুই জন জেলেকে নিজেদের ডেরায় বন্দি করেছে দস্যুরা।
বনদস্যুদের হাত থেকে কোনোমতে রক্ষা পাওয়া অপহৃতদের কয়েকজন সহকর্মী এবং তাদের ব্যবসায়িক মহাজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি নদীর সুবদেব খাল, গুবদেব খাল এবং ধান্যখালীর চর এলাকা নামক তিনটি পয়েন্টে হানা দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে এদের অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণের পরপরই দস্যুরা একটি সুনির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অপহৃতদের পরিবার ও মহাজনদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। তারা অপহৃত প্রত্যেক বনজীবীর মাথা পিছু ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করছে এবং সরকারি নজরদারি এড়াতে প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশের মাধ্যমে এই অর্থ দ্রুত পরিশোধের জন্য আলটিমেটাম দিয়েছে। ভুক্তভোগী মহাজনদের অভিযোগ, সুন্দরবনে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও অপহৃত জেলেদের ছাড়িয়ে নিতে দস্যুদের দেওয়া একই মোবাইল নম্বরে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। এমনকি চলতি মধু আহরণ মৌসুম শুরু হওয়ার অনেক আগেই বনের মৌয়ালদের ওপর অলিখিত অগ্রিম চাঁদা বা ‘জিজিয়া কর’ ধার্য করেছিল এই দস্যুরা এবং সেই চাঁদার টাকা পরিশোধের পরই কেবল বন বিভাগ থেকে পারমিট নেওয়া জেলেদের বনে প্রবেশের অনুমতি দিত এই অপরাধচক্র।
উপকূলের মানুষ ও বনজীবীদের মাঝে এই দস্যুতার পুনরাবৃত্তি নিয়ে চরম ক্ষোভ দানা বাঁধছে। এর আগে গত ৪ ও ৫ মে একই কায়দায় সুন্দরবনের গোয়ালবুনিয়া দুনিয়ার মুখ, ধান্যখালি খাল, মামুন্দ নদীর মাথাভাঙ্গা খাল এবং মালঞ্চ নদীর চালতে বেড়ের খাল এলাকা থেকে ‘আলিফ ওরফে আলিম বাহিনী’ এবং ‘নানা ভাই বাহিনী’র পরিচয় দিয়ে অন্তত ২০ জন জেলে ও মৌয়ালকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর কোনো সাহায্য না পেয়ে নিরুপায় হয়ে পরিবার ও মহাজনেরা নিজেদের উদ্যোগে প্রায় ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দেওয়ার পর সেই ২০ জন বনজীবী অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সুন্দরবনে দস্যু দমনে কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর নেতৃত্বে মাঝেমধ্যেই বিশেষ যৌথ অভিযান চালানো হলেও বাস্তবে দস্যুদের এই দৌরাত্ম্য বা আধিপত্য একটুও কমেনি, বরং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা দিন দিন চরমে পৌঁছাচ্ছে। সুন্দরবনের এই বিস্তীর্ণ ও দুর্গম নেটওয়ার্ক এখনও কার্যত দস্যুদের নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবেই রয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলার এই চরম অবনতি ও একের পর এক অপহরণের ঘটনা ঘটলেও, বন বিভাগ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য বরাবরের মতোই দায়সারা। এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন কদমতলা ফরেস্ট স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল করিম জানান, বনজীবী বা জেলে অপহরণের সুনির্দিষ্ট কোনো দাপ্তরিক তথ্য বা লিখিত খবর এখনও পর্যন্ত তাদের দপ্তরে এসে পৌঁছায়নি। তবে লোকমুখে বিষয়টি শোনার পর তারা অভ্যন্তরীণভাবে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালেদুর রহমানও প্রায় একই সুরে বলেন, সুন্দরবনে এই নতুন করে ৮ বনজীবী অপহরণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী পরিবার, স্বজন কিংবা মহাজন থানায় এসে আইনি সাহায্য চাননি বা লিখিত অভিযোগ করেননি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।