
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা, পবিত্র উপাসনালয় ও মসজিদে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক লুটপাট এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানির ঘটনার তীব্র প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে খুলনার তৌহিদী জনতা। নজিরবিহীন এই নির্যাতনের প্রতিবাদ ও বিশ্ববিবেকের দৃষ্টি আকর্ষণে বিভাগীয় শহর খুলনায় এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। খুলনা ইমাম পরিষদের আহবানে গত শুক্রবার মহানগরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলা মোড়ে এই ঐতিহাসিক গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। জুমার নামাজের পর থেকেই খুলনার বিভিন্ন প্রান্ত ও পাড়া-মহল্লা থেকে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসল্লি, বরেণ্য আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের অধিকারকামী মানুষ দলে দলে ব্যানার, ফেস্টুন ও প্লেকার্ড হাতে নিয়ে সমাবেশস্থলে সমবেত হতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ডাকবাংলা মোড় ও এর আশপাশের সংযোগ সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়, যার জেরে থমকে দাঁড়ায় নগরীর স্বাভাবিক যান চলাচল। পরবর্তীতে সমাবেশস্থল থেকে একটি সুদীর্ঘ ও সুশৃঙ্খল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে এবং পুনরায় ডাকবাংলা মোড়ে এসে শেষ হয়।
সমাবেশে উপস্থিত শীর্ষস্থানীয় ওলামা ও বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সেখানে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বসতভিটা, পৈতৃক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। আল্লাহর ঘর মসজিদে ভাঙচুর চালানো এবং সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ ও ন্যক্কারজনক ঘটনা আধুনিক সভ্য দুনিয়ায় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই নয়। বক্তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, কেবল ধর্মীয় পরিচয়কে পুঁজি করে নিরীহ মানুষের ওপর এমন নৃশংস হামলা চালানো এবং উগ্র ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে শতাব্দী প্রাচীন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার এই অপচেষ্টা কোনো সচেতন ও বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না। সভ্য সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মানুষ হত্যা, নারকীয় নির্যাতন এবং ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের এই সংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনতিবিলম্বে এই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বৈষম্যমূলক হামলা-নির্যাতন বন্ধ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান তারা।
বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের কণ্ঠেও ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদের সুর। তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়, বরং তাঁরা জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে খোদ মানবতার পক্ষে আজ রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই যখনই কোনো সংখ্যালঘু বা নিরীহ মানুষের ওপর অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম ও নিপীড়ন চালানো হবে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি বিবেকবান ও স্বাধীনতাকামী মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিবাদী নানা স্লোগানে পুরো মহানগরের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠলেও, গোটা কর্মসূচিটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়, যা খুলনাবাসীর দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে। সমাবেশের সমাপনী বক্তব্যে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, মানবতা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার এবং মানুষের মৌলিক ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন শান্তিপূর্ণ ও কঠোর প্রতিবাদী কর্মসূচি আগামীতেও রাজপথে অব্যাহত থাকবে।