
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে সাতজন বীর সন্তান তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ও অন্যতম সাহসী নাম শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান। ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান ঝিনাইদহ) মহেশপুর উপজেলার খদ্দখালিশপুর গ্রামে এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মো. আক্কাস আলী মন্ডল এবং মাতা মোসাম্মৎ কাইমুন্নেছার অভাবের সংসারে বড় হওয়া হামিদুর রহমান শৈশব থেকেই ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ও সত্যনিষ্ঠ। আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনায় ইতি টেনে বাবার হাতে হাত মেলালেও তাঁর অন্তরে ছিল দেশমাতৃকার প্রতি গভীর টান। সেই দেশপ্রেমেরই টানে ১৯৭০ সালে তিনি মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত হন।
তবে প্রশিক্ষণের শুরুতেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন পাক বাহিনীর নির্মমতা। চট্টগ্রাম ইবিআরসিতে থাকাকালীন তাঁর চোখের সামনেই আড়াই হাজার বাঙালি রিক্রুট ও সেনাসদস্যকে হত্যা করা হয়। এই ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে তিনি পায়ে হেঁটে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু ঘরে বসে থাকার মানুষ তিনি ছিলেন না। ২৫শে মার্চের কালরাত্রির পর নিজ বাড়িতে মাত্র একদিন অবস্থান করে তিনি পরদিনই বেরিয়ে পড়েন স্বাধীনতার যুদ্ধে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার ধলই বর্ডার আউটপোস্টে পৌঁছে তিনি ৪ নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর শৃঙ্খলা ও সাহসিকতা অল্প সময়ের মধ্যেই সহযোদ্ধাদের কাছে তাঁকে আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলে।
হামিদুর রহমানের বীরত্বের চূড়ান্ত পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর। ধলই সীমান্তের পাকিস্তানি ফাঁড়িটি দখলের জন্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা এক মরণপণ অভিযানে নামেন। লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর সময় মাইন বিস্ফোরণ ও পাক বাহিনীর এলএমজি পোস্টের অবিরাম গুলিবর্ষণে যখন মুক্তি বাহিনী থমকে দাঁড়ায়, তখন গ্রেনেড হামলার কঠিন দায়িত্বটি নিজের কাঁধে তুলে নেন ১৯ বছর বয়সী এই তরুণ যোদ্ধা। দুর্গম পাহাড়ি খাল দিয়ে বুকে হেঁটে অত্যন্ত কৌশলে তিনি শত্রুর সীমানার একদম কাছে চলে যান। নিখুঁত নিশানায় দুটি গ্রেনেড ছুঁড়ে তিনি পাক বাহিনীর মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও নিজেও মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হন। সেই রক্তাক্ত শরীর নিয়েই তিনি অসীম সাহসে পাক সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং হাতাহাতি যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রুর মরণাস্ত্রকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেন। তাঁর এই আত্মত্যাগের সুযোগ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত ফাঁড়িটি সফলভাবে দখল করতে সমর্থ হন, যদিও বিজয়ের সেই মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি এই বীর সেনানী।
যুদ্ধের পর এই মহান বীরের মরদেহ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামে দাফন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ উদ্যোগে তাঁর দেহাবশেষ স্বদেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় সমাহিত করা হয়। তাঁর স্মৃতিকে অমলীন রাখতে জন্মভূমি খদ্দখালিশপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘হামিদ নগর’। সেখানে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কলেজ, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি সমৃদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। ঝিনাইদহের জেলা স্টেডিয়ামটিও এই বীরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি মিলনায়তন এবং ডাক বিভাগের বিশেষ ডাকটিকিট তাঁর অনন্য বীরত্বকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে। প্রতি বছর ২৮ অক্টোবর কমলগঞ্জের ধলই চা বাগানে অবস্থিত স্মৃতিসৌধে হাজারো মানুষ জড়ো হয়ে এই নির্ভীক সৈনিকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যা আমাদের নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করে চলেছে।